কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার করা মরদেহগুলোর মধ্যে মিলেছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একটি পুরুষের মরদেহ পাওয়া গেছে এক নারীকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায়। ওই নারী আবার বুকে আগলে রেখেছিলেন একটি শিশুকে। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরা স্বামী-স্ত্রী ও তাঁদের সন্তান হতে পারেন। তবে আগুনে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে এসব তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য। তিনি জানান, রিসোর্টের একটি কক্ষে পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে একজন শিশু, দুজন নারী ও একজন পুরুষ ছিলেন। তাঁদের পাশে আরও এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
দোলন আচার্য বলেন, কক্ষটির পাশের একটি ওয়াশরুম থেকে প্রথমে একজন পুরুষের মরদেহ পাওয়া যায়। পরে ভবনের তিনতলায় তল্লাশি চালিয়ে আরও মরদেহের সন্ধান মেলে। আগুনে ভবনের অধিকাংশ কাঠামো ধসে পড়লেও টাইলস করা একটি ওয়াশরুমের অংশ তুলনামূলক অক্ষত থাকায় সেখানে মরদেহগুলো পাওয়া সম্ভব হয়েছে। ভবনের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় রশি ব্যবহার করে মরদেহগুলো নিচে নামাতে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, একটি পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ থাকার তথ্যের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি মরদেহের মিল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মরদেহগুলো ওই পরিবারের সদস্যদের কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, রিসোর্টের নিচতলায় রেস্টুরেন্ট ও রান্নাঘর ছিল। দোতলা ও তিনতলার বড় অংশ কাঠের বোর্ড দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। ভবনের সিঁড়িও কাঠ ও বাঁশের হওয়ায় আগুন লাগার পর দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ওপরের তলায় থাকা লোকজনের নিচে নামার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ভবনের দুর্বল কাঠামোর কারণে ওপরের তলায় থাকা ব্যক্তিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ, নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামী, জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।
আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাঁকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোরশেদ ও তানভীরের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মো. মান্নান।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, টুপটুপ রিসোর্টের নির্মাণে কউকের অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান থাকায় অনুমোদন যাচাইয়ে সময় লাগছে। ইতিমধ্যে আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে বৈধতা নিশ্চিত করতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স ছিল না। প্রয়োজনীয় অনুমোদন না নেওয়ায় আগে সতর্ক করা হয়েছিল। লাইসেন্স না থাকায় আরও দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিশেষ করে স্ত্রীকে জড়িয়ে থাকা পুরুষ ও মায়ের বুকে আগলে থাকা শিশুর মরদেহের দৃশ্য উদ্ধারকর্মীদেরও আবেগাপ্লুত করেছে। তবে ওই মরদেহগুলোর পরিচয় ও তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত হতে তদন্ত এবং পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া শেষ হওয়া প্রয়োজন।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।