‎গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র: ফতোয়ায়ে শামীতে কী বলা হয়েছে?

‎ফতোয়ায়ে শামীতে সাধারণ গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কঠোর বক্তব্য রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে—যেমন দফের বিশেষ ব্যবহার এবং বাদ্যযন্ত্রবিহীন বৈধ কবিতা বা সুর—শর্তসাপেক্ষে আলাদা বিধানও আলোচিত হয়েছে। তাই বিশেষ অনুমতিকে সাধারণ অনুমতি এবং সাধারণ নিষেধাজ্ঞাকে প্রতিটি ধরনের কণ্ঠস্বর বা কবিতার ওপর প্রয়োগ—দুটিই এড়িয়ে বিষয়টি শর্ত ও প্রেক্ষাপটসহ বোঝা প্রয়োজন।
15345
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

ইসলামী শরিয়তে গান, সুর ও বাদ্যযন্ত্রের বিধান নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার আলাদ্দুররিল মুখতার’ (ফতোয়ায়ে শামী)-তে গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন পরিস্থিতির বিধান পৃথকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাই কোনো একটি বক্তব্যকে পুরো আলোচনার সারসংক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন না করে, বিষয়টি তার শর্ত ও প্রেক্ষাপটসহ বোঝা প্রয়োজন
‎
‎আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.)-এর আলোচনায় গান শোনার ব্যাপারে কঠোর বক্তব্য পাওয়া যায়। উদ্ধৃত ইবারত হিসেবে উল্লেখ করা হয়—
‎وَإِنْ كَانَ سَمَاعَ غِنَاءٍ فَهُوَ حَرَامٌ بِإِجْمَاعِ الْعُلَمَاءِ
‎অর্থাৎ, “যদি তা গান শোনা হয়, তাহলে তা হারাম—আলেমদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে।”
‎তবে ফিকহের আলোচনায় সব ধরনের কণ্ঠস্বর, কবিতা, সুর বা আনন্দের প্রকাশকে একই শ্রেণিতে রাখা হয়নি। বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে শর্তসাপেক্ষে ছাড়ের কথাও এসেছে।
‎
‎১. বাদ্যযন্ত্র ছাড়া নির্দোষ সুর ও কবিতা
‎যে কথায় অশ্লীলতা, কুফরি বক্তব্য, গুনাহের প্রতি উৎসাহ বা শরিয়তবিরোধী বিষয় নেই এবং যার সঙ্গে নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্র যুক্ত নয়—এ ধরনের কবিতা বা হামদ-নাত সুর করে পড়ার বিষয়ে ফকিহদের আলোচনায় কিছু অবকাশ পাওয়া যায়।
‎উদাহরণ হিসেবে বলা হয়—
‎একাকীত্ব বা মানসিক ক্লান্তি দূর করার জন্য নির্দোষ কবিতা গুনগুন করা;
‎দীর্ঘ সফর বা পরিশ্রমের সময় উদ্দীপনামূলক কবিতা বা বৈধ সুর ব্যবহার করা;
‎হামদ, নাত বা প্রশংসামূলক কবিতা সুর করে পাঠ করা।
‎
‎এক্ষেত্রে কথার বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য, পরিবেশ এবং কোনো নিষিদ্ধ উপাদান যুক্ত হয়েছে কি না—সবই বিবেচ্য।
‎
‎২. ‘দফ’ বাজানোর বিশেষ বিধান
‎ফিকহের গ্রন্থগুলোতে দফ বা এক ধরনের সরল হাতবাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে অনুমতির কথা আলোচনা করা হয়েছে। এটি সাধারণ বাদ্যযন্ত্রের অনুমতি হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়।
‎বিশেষত—
‎বিবাহ:
‎বিবাহের ঘোষণা ও আনন্দ প্রকাশের ক্ষেত্রে দফ ব্যবহারের অনুমতির কথা হাদিস ও ফিকহের আলোচনায় এসেছে।
‎ঈদ ও আনন্দের উপলক্ষ:
‎ঈদের মতো বৈধ আনন্দের দিনে বিশেষ পরিস্থিতিতে দফ ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
‎
‎তবে দফের প্রকৃতি নিয়েও ফকিহদের বিস্তারিত আলোচনা আছে। এর মধ্যে যদি এমন ঝুনঝুনি, ধাতব অংশ বা শব্দ-উৎপাদক ব্যবস্থা থাকে, যা সেটিকে প্রচলিত বাদ্যযন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেটিকে সাধারণ দফের অনুমতির সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
‎
‎অতএব, ‘দফ জায়েজ’—এই কথাকে ‘সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র জায়েজ’ হিসেবে প্রচার করা ফিকহি আলোচনার সঠিক উপস্থাপন নয়।
‎৩. সুফি ‘সেমা’ প্রসঙ্গ
‎ইসলামী আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাসে সেমা বা আল্লাহর স্মরণ ও আধ্যাত্মিক ভাব জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে কবিতা/কালাম শ্রবণের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। এ বিষয়ে সুফি আলেমদের মধ্যেও বিভিন্ন মত ও শর্ত পাওয়া যায়।
‎
‎কিছু আলেম বাদ্যযন্ত্রবিহীন, শরিয়তসম্মত বক্তব্যের আধ্যাত্মিক কবিতা বা কালাম শোনাকে নির্দিষ্ট শর্তে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। আবার অন্য অনেক আলেম সেমার বিভিন্ন প্রচলিত রূপের সমালোচনা করেছেন।
‎
‎তাই ‘সেমা আছে, অতএব সব ধরনের গান-বাজনা জায়েজ’—এমন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঠিক নয়। সেমার ক্ষেত্রে কী পড়া হচ্ছে, কীভাবে পড়া হচ্ছে, বাদ্যযন্ত্র আছে কি না, নাচ বা শরিয়তবিরোধী আচরণ হচ্ছে কি না এবং শ্রোতা-পরিবেশ কেমন—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
‎
‎৪. মূল বিষয়টি কোথায়?
‎ফতোয়ায়ে শামীসহ হানাফি ফিকহের আলোচনাগুলো থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—গান, কবিতা, কণ্ঠস্বর, দফ এবং বাদ্যযন্ত্র—সবকিছুকে একই বিধানের মধ্যে ফেলা যায় না।
‎একদিকে সাধারণ গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞার বক্তব্য রয়েছে; অন্যদিকে বিবাহ, ঈদ বা নির্দিষ্ট বৈধ আনন্দের ক্ষেত্রে দফের বিশেষ বিধান এবং বাদ্যযন্ত্রবিহীন বৈধ কবিতা বা সুরের বিষয়ে পৃথক আলোচনা রয়েছে।
‎
‎সুতরাং ‘ইসলামে সব গান হারাম’ অথবা ‘ইসলামে সব ইসলামি গান ও বাদ্যযন্ত্র জায়েজ’—দুটি বাক্যের কোনোটিই বিস্তারিত ফিকহি আলোচনার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না।
‎
‎৫. সতর্কতা
‎ফিকহের কোনো গ্রন্থ থেকে একটি ইবারত বিচ্ছিন্নভাবে তুলে ধরে সামগ্রিক ফতোয়া তৈরি করা উচিত নয়। বিশেষ করে ‘ইজমা’, দফের অনুমতি, সেমা, কণ্ঠসঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্র—এসব বিষয়ে আরবি মূল ইবারত, তার পূর্বাপর আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট অধ্যায় একসঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
‎এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা ভিডিওর ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য মুদ্রিত সংস্করণ থেকে ফতোয়ায়ে শামী/রদ্দুল মুহতার-এর মূল আরবি ইবারত ও খণ্ড-পৃষ্ঠা যাচাই করে মতামত দেওয়া অধিক নিরাপদ।
‎
‎সারকথা:
‎ফতোয়ায়ে শামীতে সাধারণ গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কঠোর বক্তব্য রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে—যেমন দফের বিশেষ ব্যবহার এবং বাদ্যযন্ত্রবিহীন বৈধ কবিতা বা সুর—শর্তসাপেক্ষে আলাদা বিধানও আলোচিত হয়েছে। তাই বিশেষ অনুমতিকে সাধারণ অনুমতি এবং সাধারণ নিষেধাজ্ঞাকে প্রতিটি ধরনের কণ্ঠস্বর বা কবিতার ওপর প্রয়োগ—দুটিই এড়িয়ে বিষয়টি শর্ত ও প্রেক্ষাপটসহ বোঝা প্রয়োজন।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য ০

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার ↗ PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ ↗ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী ↗ PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ ↗