
গাজী তানভীর আহমদ: বহুকাল ধরে, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে গোষ্ঠীগত সংঘাত, দাঙ্গা এবং ‘টেঁটা যুদ্ধ’ একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, শরীয়তপুরসহ দেশের বেশ কিছু জেলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই বা ততোধিক বংশ বা গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ নেয়। সামান্য ব্যক্তিগত বিরোধ, পূর্ব শত্রুতা, জমির আইল কাটা বা কথা-কাটাকাটির মতো ব্যক্তিগত অপরাধ কিংবা শত্রুতা রাতারাতি রূপ নেয় পুরো গ্রামের জীবন-মরণ লড়াইয়ে।
দুর্ভাগ্যবশত, এসব সংঘাতের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে গ্রামীণ সর্দার-মাদবরদের গোষ্ঠীগত আধিপত্য টিকিয়ে রাখার মধ্যযুগীয় মানসিকতা। আর এতে স্থানীয় পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের একটি অংশের পক্ষপাতিত্ব ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রতিযোগিতা এ সংঘাতকে সমাধানের পরিবর্তে চিরকালীন সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। আমার এই বিশ্লেষণধর্মী লেখার উদ্দেশ্য হলো গ্রামীণ সহিংস সংস্কৃতির ভয়াবহতা বিশ্লেষণ এবং ইসলাম ও সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এর স্থায়ী সমাধানের পথ অনুসন্ধান করা।
সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ক্ষয়ক্ষতি : গোষ্ঠীগত দাঙ্গার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে টেঁটা যুদ্ধের কারণে প্রতি বছর শত শত তাজা প্রাণ ঝরে যায়, পঙ্গুত্ব বরণ করে অসংখ্য মানুষ। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ফলে বিলীন হয়ে যায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। সেই সাথে পুরুষ সদস্যরা বছরের পর বছর মামলা-হামলার ভয়ে বাড়িছাড়া থাকায় তাদের প্রত্যেকের পরিবারে কৃষি ও ব্যবসায়িক স্থবিরতা নেমে আসে ভয়ঙ্করভাবে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় শিশু এবং নারীরা। শিশুদের শিক্ষা এবং মানসিক বিকাশের জায়গাটা মারাত্মকভাবে বাঁধাগ্রস্ত হয়।
এসব ক্ষেত্রে গ্রামীণ মোড়ল ও সর্দাররা অনেক সময় নিজেদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার দাপট টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের নিরপেক্ষ ভূমিকার অভাব এই সমস্যাকে জিইয়ে রাখে। যখন অপরাধী শাস্তি না পেয়ে অর্থের বিনিময়ে পার পেয়ে যায়, তখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে উৎসাহিত হয়। সুতরাং স্পষ্ট যে, গোষ্ঠীগত আধিপত্য এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এ সমস্যাকে অদ্যাবধি টিকিয়ে রেখেছে।
আসুন জেনে নিই, এ বিষয়ে ইসলাম ও পবিত্র কোরআন-হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি কি?
পবিত্র ইসলাম ধর্ম শান্তি, সম্প্রীতি এবং ন্যায়ের শিক্ষা দেয়। ইসলামে গোষ্ঠীগত অহংকার, অন্ধ আনুগত্য এবং অন্যায় সংঘাতকে ‘জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকার যুগের বর্বরতা হিসেবে তীব্রভাবে নিন্দা করা হয়েছে। যেমন,
গোষ্ঠীগত অন্ধত্ব ও সংকীর্ণতার (আসাবিয়াহ) নিন্দা : জাহেলী যুগে মানুষ নিজের গোত্র বা বংশের লোক অন্যায় করলেও তার পক্ষ নিত। গ্রামীণ ‘টেঁটা যুদ্ধ’ ও দাঙ্গার মূল ভিত্তিও এই অন্ধ গোষ্ঠীপ্রীতি। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন : “যে ব্যক্তি আসাবিয়াহ (বংশীয় বা গোষ্ঠীগত অন্ধ গোঁড়ামি)-র দিকে ডাকল বা এর পক্ষে লড়াই করল অথবা এর ওপর মৃত্যুবরণ করল, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১২১)
ইসলাম শেখায় যে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকতে হবে। এখানে নিজের গোষ্ঠীর লোক অন্যায় করলেও তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন :”হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাক এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সত্য সাক্ষ্য দাও, তা যদি তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতামাতা বা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেও হয়।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৩৫)
শান্তি স্থাপন ও মধ্যস্থতার নির্দেশ : গ্রামে যখন দুটি পক্ষ বিবাদে লিপ্ত হয়, তখন সমাজ ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো বসে তা মীমাংসা করা, কোনো এক পক্ষের অন্ধ সমর্থন করা নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে :
“যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও… নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমাদের ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করো।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৯-১০)
ঘুষ, দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের ভয়াবহতা : তদন্ত বা বিচারকার্যে পুলিশ বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ঘুষ গ্রহণ এবং অন্যায় পক্ষাবলম্বন ইসলামে কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে অভিশাপ দিয়েছেন : “ঘুষ দাতা এবং ঘুষ গ্রহণকারী উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত (অভিশাপ)।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
বিচারক বা আমলাদের অসততা সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল কারণ তাদের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধ করলে ছেড়ে দেওয়া হতো, আর দুর্বল ব্যক্তি অপরাধ করলে শাস্তি দেওয়া হতো।
এবার জানা প্রয়োজন, এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিকোণ ও সামাজিক বিশ্লেষণ :
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, টেঁটা যুদ্ধ বা গ্রামীণ দাঙ্গা কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। এ বিষয়ে কিছু রেফারেন্সমূলক আলোচনা প্রয়োজন মনে করছি। যেমন,
সামাজিক সংহতি এবং ‘মেকানিক্যাল সলিডারিটি’ : ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইম (Émile Durkheim) তাঁর ‘সামাজিক সংহতি’ (Social Solidarity) তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, আদিম বা গ্রামীণ সমাজে ‘মেকানিক্যাল সলিডারিটি’ (যান্ত্রিক সংহতি) প্রবল থাকে। এখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চেয়ে গোষ্ঠীগত পরিচয় বড় হয়ে ওঠে। ফলে গোষ্ঠীর একজনের অপমান বা অপরাধ পুরো গোষ্ঠীর সম্মান ও অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিকায়ন ও শিক্ষার অভাবের কারণে এই অন্ধ সংহতি দাঙ্গার রূপ নেয়।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সর্দারী প্রথা : জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার (Max Weber)-এর ক্ষমতার উৎস (Sources of Power) তত্ত্ব অনুযায়ী, গ্রামীণ সর্দাররা ‘ঐতিহ্যগত কর্তৃত্ব’ (Traditional Authority) এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দাঙ্গাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষকে সংকীর্ণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত রেখে সর্দাররা নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা : আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন (Robert K. Merton) তাঁর ‘অ্যানোমি থিওরি’ (Anomie Theory)-তে দেখিয়েছেন, যখন কোনো সমাজে প্রচলিত নিয়ম-কানুন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন: পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা) সঠিকভাবে কাজ করে না, তখন সমাজে এক ধরনের নৈরাজ্য বা ‘অ্যানোমি’ তৈরি হয়। মানুষ তখন রাষ্ট্রীয় আইনের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের দল বা গোষ্ঠীর শক্তির ওপর ভরসা করতে শুরু করে।
এই মুহূর্তে এসব ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এ ধরনের সংঘাত বন্ধ করতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। যেমন,
খুতবার মাধ্যমে সচেতনতা : দেশের প্রতিটি মসজিদের ইমাম ও খতিবদের জুমার খুতবায় গোষ্ঠীগত অহংকার, দাঙ্গা-হাঙ্গামার কুফল এবং শান্তি ও সম্প্রীতির গুরুত্ব নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে।ন্যায়বিচারের চর্চা : গ্রামীণ মুসলমানদের বোঝাতে হবে যে, অন্যায়ভাবে নিজের বংশের পক্ষে দাঁড়িয়ে অন্য বংশের ওপর আক্রমণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম এবং পরকালে এর জন্য কঠিন শাস্তি পেতে হবে।নিরপেক্ষ পুলিশিং : পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। দাঙ্গাবাজদের আশ্রয়দাতা মাদবর বা সর্দাররা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
স্পেশাল ড্রাইভ ও অস্ত্র উদ্ধার : টেঁটা, বল্লম, রামদা ও দেশীয় অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করতে হবে এবং নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করতে হবে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা : দাঙ্গার মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) : গ্রামীণ সর্দারদের একচেটিয়া সালিশি ব্যবস্থার পরিবর্তে সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্র বা লিগ্যাল এইড-এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও আইনি কাঠামোর অধীনে গ্রাম্য বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিস্তার : সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। বেকার তরুণ সমাজকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হবে, যাতে তারা দাঙ্গার মতো ধ্বংসাত্মক কাজে জড়ানোর সময় না পায়।
অপরাধীর ব্যক্তিগত দায় নিশ্চিতকরণ : সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, সামষ্টিক শাস্তির বদলে ‘ব্যক্তিগত অপরাধের ব্যক্তিগত শাস্তি’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একজনের অপরাধের জন্য পুরো গোষ্ঠী বা বংশকে দায়ী করার কুপ্রথা বন্ধ করতে হবে। তবেই আমরা একটি সুন্দর ও টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে পারবো বলে দৃঢ় বিশ্বাস।
মোটকথা, ব্যক্তিগত অপরাধ বা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোষ্ঠীগত দাঙ্গা বা টেঁটা যুদ্ধ কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এটি আমাদের গ্রামীণ সমাজের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং অগণিত পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এই অন্ধকার থেকে বের হতে হলে আমাদের যেমন ইসলামের সুমহান ভ্রাতৃত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের আদর্শকে ধারণ করতে হবে, তেমনি সমাজবিজ্ঞানীদের নির্দেশিত পথে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।
সর্বোপরি প্রশাসন যদি সৎ, নিরপেক্ষ ও কঠোর হয় এবং সাধারণ মানুষ যদি অন্ধ গোষ্ঠীপ্রীতি পরিহার করে সচেতন হয়, তবেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে টেকসই শান্তি ও প্রগতির সুবাতাস বয়ে আনা সম্ভব।
