নগরায়নের চাপ, নিয়ম না মানা ভবন—ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি

লেখক: মো মনির হোসেন
প্রকাশ: ১১ মাস আগে

ব্রাহ্মনবাড়িয়া প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের চেহারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিস্তৃত হচ্ছে নগরায়নের পরিধিও। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পৌরসভা আজ প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরের পাড়া-মহল্লা জুড়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য নতুন ভবন। প্রতিদিন সকাল হতেই চোখে পড়ে বহু বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ। তবে এসব ভবন নির্মাণে অনুসরণ করা হচ্ছে না কাঠামোগত নিরাপত্তা বিধান, স্থাপত্য কৌশল কিংবা আধুনিক ভবন নির্মাণ নীতিমালা।

বহুতল ভবন নির্মাণে যেমন অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক, তেমনি প্রয়োজন বিদ্যুৎ লাইনের ছাড়পত্র, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্প, আলো-বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং উইটিবি বাস্তবায়নের মতো নীতিমালাও। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত থাকছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। নির্মাণ চলছে নির্বিচারে, যেন কোনোরকম বাধা বা তদারকি নেই। ফলে শহরের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন শঙ্কা।

নদী ও প্রকৃতিসুরক্ষা সমাজিক আন্দোলন তরী বাংলাদেশের আহবায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে দিন দিন ভবনের সংখ্যা বাড়ছে। এতে আমাদের মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভবন নির্মাণকাজ থামিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর কিছুদিন পর আবারো কাজ চালু হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে।

তিনি আরো বলেন, আমরা জানি পুরো শহর তিনজন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। তারাও বিভিন্ন সময় অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এভাবে ভবন নির্মাণের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহন ঢুকতে পারে না। আমরা চাই, পৌর কর্তৃপক্ষ যেন এ ব্যাপারে আরো কঠোর হয়।’

পৌরসভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো শহর জুড়ে হোল্ডিং নাম্বারপ্রাপ্ত বাড়ির সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে যে ভবনগুলো ছয়তলা বা তার চেয়েও বেশি উচ্চতার, সেগুলোকে ধরা হচ্ছে ‘বহুতল ভবন’ হিসেবে। এই ধরনের ভবনের সংখ্যা এখন দেড় শতাধিক। এর বাইরে আরও বহু ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে, যেগুলো শেষ হলে সংখ্যাটি আরও বাড়বে। এসব ভবনের বড় অংশেই নিয়ম অনুযায়ী অনুমতি নেওয়া হয়নি, আবার অনেকেই অনুমতি নিয়েও মানছেন না প্রযোজ্য নিয়ম ও নীতিমালা।

অবাক করার বিষয় হলো, এতসব অনিয়মের মাঝেও পৌর কর্তৃপক্ষ রয়েছে প্রায় নিশ্চুপ। অভিযোগ রয়েছে, তদারকির অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যার পরিণতিতে বেড়ে চলেছে আগুন লাগা, ভবন ধস কিংবা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য আশ্বাস এসেছে। পৌরসভার পৌর প্রশাসক জানিয়েছেন, অবৈধভাবে নির্মিত ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যারা নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসকও বলেছেন, নতুন করে কেউ যেন অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে।

বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর বিস্তৃত প্রায় সাড়ে ১৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায়। এই শহরে ছোট-বড়-মাঝারি মিলিয়ে ভবনের সংখ্যা ৮ শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক ভবন রয়েছে এমন, যেগুলোর কাঠামোগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার।

নগরায়নের বিকাশ শহরের জন্য আশীর্বাদ হলেও, যদি তা নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ঘটে, তবে তা হতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বর্তমান পরিস্থিতি তাই এখনই নজরদারি, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ দাবি করে।