বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এখন প্রয়োজন জবাবদিহি, ঐক্য ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তা

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি কিংবা দলের পরিবর্তে সংবিধান, আইন ও নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুধু ছোটখাটো অনিয়মে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য একই আইন কার্যকর হওয়ার দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।
সম্পাদকীয়
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

বাংলাদেশ
আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে
আছে, যখন রাষ্ট্রের সামনে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, বরং সেই উন্নয়নের চরিত্র কেমন হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা নাগরিকবান্ধব হবে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেই প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, ক্ষমতার পালাবদল হবে, নতুন নেতৃত্ব আসবে। কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক মর্যাদা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না।

আমাদের
সবচেয়ে বড় শক্তি দেশের
মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, প্রবাসী, শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রজন্ম প্রতিদিন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছে। অথচ দ্রব্যমূল্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি, সেবাপ্রাপ্তিতে হয়রানি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে। উন্নয়নের সুফল তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত নাগরিক
বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারেন, চিকিৎসা শিক্ষা পান
এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ে তাকে প্রভাবশালীর দ্বারস্থ হতে না হয়।

 

রাষ্ট্রীয়
প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি কিংবা দলের পরিবর্তে সংবিধান, আইন নাগরিকের প্রতি
দায়বদ্ধ থাকতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুধু ছোটখাটো অনিয়মে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ক্ষমতাবান সাধারণ নাগরিকের
জন্য একই আইন কার্যকর হওয়ার দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।

 

বাংলাদেশের
ভবিষ্যতের আরেকটি বড় প্রশ্ন তরুণ
সমাজ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। তাঁদের সামনে যদি দক্ষতা অর্জন, গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা হওয়া এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হয়, তাহলে
দেশের সবচেয়ে মূল্যবান জনশক্তিই হতাশায় আক্রান্ত হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু সনদ দেওয়ার কাঠামো থেকে বের করে জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা নৈতিকতার সঙ্গে
যুক্ত করা জরুরি।

 

একইভাবে
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দায়িত্বশীলতা একটি
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য ভিত্তি। সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে কিংবা
সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করে সাময়িকভাবে অস্বস্তিকর সত্য আড়াল করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু তাতে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। আবার
স্বাধীনতার নামে যাচাইহীন তথ্য, অপপ্রচার বা ব্যক্তির মর্যাদাহানিও
সাংবাদিকতা হতে পারে না। প্রয়োজন স্বাধীন, পেশাদার এবং জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম।

 

রাজনৈতিক
দলগুলোরও উপলব্ধি করা প্রয়োজন, প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু নয়। মতের পার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। সহিংসতা, প্রতিহিংসা বিভাজনের রাজনীতি
শেষ পর্যন্ত কোনো দলকেই স্থায়ীভাবে লাভবান করে না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ। নির্বাচন,
সংসদ, স্থানীয় সরকার এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে জনগণের অংশগ্রহণ মত প্রকাশের
কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

 

একই
সঙ্গে গ্রাম শহরের বৈষম্য
কমানো জরুরি। বাংলাদেশের উন্নয়ন শুধু রাজধানী বা কয়েকটি বড়
শহরের অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রত্যন্ত গ্রামের একটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষা, একজন রোগীর চিকিৎসা, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং একজন তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগও উন্নয়নের মাপকাঠি।

আমাদের
সামনে সম্ভাবনা কম নয়। জনশক্তি,
কৃষি, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি ডিজিটাল অর্থনীতি
বাংলাদেশের জন্য বড় শক্তি হতে
পারে। কিন্তু সম্ভাবনাকে টেকসই অর্জনে রূপ দিতে প্রয়োজন সুশাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা।

 

বাংলাদেশ
কোনো একটি দল, গোষ্ঠী কিংবা প্রজন্মের একার নয়। এই দেশ মুক্তিযুদ্ধের
আত্মত্যাগ, সাধারণ মানুষের শ্রম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্বপ্নে
নির্মিত। তাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া
উচিত মানুষের মর্যাদা।

রাষ্ট্রের
সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি কেবল উঁচু ভবন, সেতু কিংবা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। একজন সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদ, স্বাধীন, ন্যায়বিচারপ্রাপ্ত এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অর্জন।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ