ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ এখনও নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হৃদয়ে ধারণ করে: এমপি শ্যামল

সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে যখন নদীর বুক ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে, তখনও মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফিরছিল বৈঠার সেই ছন্দ। তিতাস যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—নদী শুধু জলধারা নয়, এটি একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের প্রাণের স্পন্দন।
51258
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

ভাদ্রের বিকেল। আকাশে রোদের তেজ কিছুটা কমতেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর দুই তীরে জমতে শুরু করে মানুষের ঢল। শিশু, কিশোর, যুবক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে নদীপাড়। সবার চোখ নদীর বুকে। অপেক্ষা একটাই—কবে শুরু হবে বহু প্রতীক্ষিত নৌকা বাইচ।

হঠাৎই নদীর বুক কাঁপিয়ে ভেসে আসে মাঝিদের সমবেত সুর—‘মারো টান, হেইও…’। মুহূর্তেই যেন জেগে ওঠে তিতাস। বৈঠার ছন্দে ছন্দে এগিয়ে যেতে থাকে সারি সারি নৌকা। নদীর জলে ফেনা তুলে যখন প্রতিযোগী নৌকাগুলো সামনে ছুটে চলে, তখন দুই তীরের হাজারো মানুষের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দীর্ঘ তিন বছর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী তিতাস নদীতে অনুষ্ঠিত হলো নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ প্রতিযোগিতা শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজনই নয়, বরং হয়ে ওঠে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতির এক বর্ণিল পুনর্মিলনী।

দুপুর ২টায় প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল। উদ্বোধনের পরই নদীর দুই তীর উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়।

তিতাসপাড়ের মানুষের কাছে নৌকা বাইচ শুধুই প্রতিযোগিতা নয়, এটি আবেগ, ঐতিহ্য এবং শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্কের এক অনন্য প্রকাশ। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী এবং নৌকা।

জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, “নৌকা বাইচ বাংলার ঐতিহ্যের অংশ। হাওর অধ্যুষিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জীবনের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর এ আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।”

নদীর বুকে যখন ১০টি প্রতিযোগী নৌকা একসঙ্গে বৈঠা চালাতে শুরু করে, তখন সৃষ্টি হয় এক রোমাঞ্চকর দৃশ্য। একই রঙের পোশাকে সজ্জিত মাঝিমাল্লারা সর্দারের নির্দেশনায় একযোগে বৈঠা চালিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। প্রতিটি বৈঠার আঘাতে ছিটকে ওঠা পানির ফোঁটা আর দর্শকদের করতালি যেন মিশে যায় এক সুরে।

নৌকা বাইচ দেখতে আসা তরী বাংলাদেশের এর আহবায়ক শামীম আহমেদ ও সদস্য সোহেল রানা ভূইয়া বলেন, “ছোটবেলায় এমন আয়োজন দেখেছি। অনেক দিন পর আবার তিতাসে নৌকা বাইচ দেখতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এই আয়োজন নিয়মিত হওয়া উচিত।”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এমপি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে বিভিন্ন সময় নানা মন্তব্য করা হয়। কিন্তু আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করে, এখানকার মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এখনও হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন।”

প্রতিযোগিতার শেষ মুহূর্ত ছিল সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ। নদীর বুক চিরে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যায় প্রতিযোগী নৌকাগুলো। দর্শকদের চিৎকার আর উৎসাহের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ক্ষমতাপুরের শাপলা বয়েজ ক্লাব প্রথম স্থান অর্জন করে। দ্বিতীয় হয় মজলিশপুরের জয়নাল আবেদিন ও জিল্লুর রহমানের দল এবং তৃতীয় স্থান দখল করে নবীনগর উপজেলার ফইল দল।

প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও মোট সাড়ে চার লাখ টাকার পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি ছিল মানুষের ভালোবাসা আর ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ।

সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে যখন নদীর বুক ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে, তখনও মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফিরছিল বৈঠার সেই ছন্দ। তিতাস যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—নদী শুধু জলধারা নয়, এটি একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের প্রাণের স্পন্দন।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ