মোবাইল-ফাস্টফুড আর বসে থাকা জীবনযাপনেই বাড়ছে স্ট্রোক : বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

মোবাইল-ফাস্টফুড আর বসে থাকা জীবনযাপনেই বাড়ছে স্ট্রোক : বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
মোবাইল-ফাস্টফুড আর বসে থাকা জীবনযাপনেই বাড়ছে স্ট্রোক : বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনযাপন, ফাস্টফুডে আসক্তি এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাব— এই তিনের মিলিত প্রভাবে নীরবে বাড়ছে স্ট্রোকের ঝুঁকি। বয়স বা শ্রেণি নির্বিশেষে এখন শিশু থেকে তরুণ— সবার মধ্যেই রক্তনালীর রোগ ও স্ট্রোকের আশঙ্কা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

রোববার (২ নভেম্বর) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগ আয়োজিত বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে এক সেমিনারে এই তথ্য তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

বক্তারা বলেন, জীবনধারার পরিবর্তনই এখন স্ট্রোকের মূল কারণ। নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম না করা, মোবাইল ও স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় দেওয়া, আর অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস— একত্রে শরীরে স্থবিরতা সৃষ্টি করে। এতে রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা একসময় স্ট্রোকে রূপ নেয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সুমন রানা বলেন,  স্ট্রোকের মূল সমস্যা আসলে লাইফস্টাইলের সমস্যা। মোবাইল ব্যবহারের সঙ্গে স্ট্রোকের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, মোবাইল আমাদের বসিয়ে রাখে— আমরা হাঁটি না, দৌড়াই না, নড়াচড়া করি না। ফলে শরীরে স্থবিরতা আসে, যা ধীরে ধীরে রক্তনালী ও মস্তিষ্কের ক্ষতি করে।

তিনি আরও বলেন, মোবাইল থেকে নির্গত বিকিরণ বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে স্ট্রোকের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক এখনো পাওয়া যায়নি।

ডা. সুমন রানা জানান, বর্তমানে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে গড়ে দুইজন শিশুর স্ট্রোক শনাক্ত হচ্ছে। শিশুদের স্ট্রোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ময়াময়া ডিজিজ, যা একধরনের জেনেটিক সমস্যা। এতে মস্তিষ্কের রক্তনালীগুলো ধীরে ধীরে সরু হয়ে যায়, ফলে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।

ঢামেক হাসপাতালের এন্ডোভাসকুলার ও স্ট্রোক সার্জারি ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোতাশিমুল হাসান (শিপলু) বলেন, এখনকার শিশুদের খাদ্যাভ্যাস পুরোপুরি বদলে গেছে। ফাস্টফুডই তাদের প্রধান খাবার হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে মাঠে খেলা বা দৌড়ঝাঁপ প্রায় বন্ধ। ফলে অল্প বয়সেই রক্তনালী শক্ত ও সরু হয়ে যাচ্ছে।

তিনি যোগ করেন, অল্প বয়সে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা এবং ইনঅ্যাকটিভ লাইফস্টাইলের কারণে তরুণদের মধ্যেও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্ট্রোক প্রতিরোধযোগ্য বলে উল্লেখ করে ডা. শিপলু বলেন, ঝুঁকির কারণগুলো দুই ভাগে বিভক্ত— প্রাইমারি ফ্যাক্টর (অপরিবর্তনযোগ্য) যেমন বয়স ও লিঙ্গ, আর মডিফায়েবল ফ্যাক্টর (পরিবর্তনযোগ্য) যেমন রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ও রক্তে চর্বির মাত্রা।সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিলে স্ট্রোকের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব,” বলেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, আর্লি রিহ্যাবিলিটেশন মানেই আর্লি গুড আউটকাম। অর্থাৎ, যত দ্রুত পুনর্বাসন শুরু করা যায়, রোগীর আরোগ্য তত দ্রুত হয়।

তার মতে, রক্ত জমাট বাঁধাজনিত স্ট্রোকের রোগীর ক্ষেত্রে পুনর্বাসন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুরু করা উচিত, আর রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকে এক সপ্তাহ পর শুরু করা ভালো।

তিনি আরও বলেন, স্ট্রোক রিহ্যাবিলিটেশন কোনো একক চিকিৎসকের কাজ নয়; এটি ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট ও চিকিৎসকদের সমন্বিত টিমওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে পাঠ্যপুস্তক সংস্কারে আহ্বান জানান ডা. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে স্ট্রোক নিয়ে একটি টপিক থাকলেও, সেখানে পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া হয়নি। পাঠ্যবই প্রণয়নে ফিজিশিয়ানদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

তিনি আরও যোগ করেন, শিশুদের পাঠ্যবইয়ে স্পোর্টস ইনজুরি, ব্যাক পেইন, নেক পেইন ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক ধারণা থাকা উচিত, যাতে তারা ছোটবেলা থেকেই নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাস্টফুড, অলসতা ও স্ক্রিনভিত্তিক জীবনযাপন আমাদের শরীরকে নীরবে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নিয়মিত হাঁটা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, ও সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা— এই তিনটিই হতে পারে স্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ