যে দেশে কন্যাশিশু নিরাপদ নয়

সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।”— এই কথাটি আজ বাংলাদেশের অসংখ্য অসহায় পিতামাতার বুকের ভেতর জমে থাকা আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। বিশ্বাস করুন এটি কোনো নাটকীয় সংলাপ নয়, কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও নয়। এটি এমন এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উচ্চারিত অভিশাপ, যে রাষ্ট্র দিনের পর দিন তার শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যে রাষ্ট্র ধর্ষকের ভয় দেখাতে পারেনি, খুনির হাত থামাতে পারেনি, নির্যাতিত মানুষের চোখের জল মুছাতে পারেনি।

আজ বাংলাদেশে একটি ভয়ঙ্কর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। শিশুরা আর নিরাপদ নয়। কন্যাশিশুরা ঘরের ভেতর নিরাপদ নয়, স্কুলে নিরাপদ নয়, রাস্তায় নিরাপদ নয়, এমনকি আপনজনের কাছেও নিরাপদ নয়। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই ধর্ষণ, নির্যাতন, নিখোঁজ, হত্যার খবর। এই দেশের মাটিতে মানুষের ভেতরের মানবতা ধীরে ধীরে পচে যাচ্ছে। আর সেই পচনের দুর্গন্ধ ঢেকে রাখার জন্য রাষ্ট্র ব্যস্ত কেবল বিবৃতি দিতে, আশ্বাস দিতে, ফাইল সরাতে।

একটি শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন শুধু একটি শরীর ক্ষতবিক্ষত হয় না। একটি পরিবার ভেঙে পড়ে। একটি সমাজ ব্যর্থ হয়। একটি রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে যায়।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো, মানুষ এখন আর বিচারের আশায় বুক বাঁধে না। কারণ তারা দেখেছে, কত মা আদালতের সিঁড়িতে সিঁড়িতে ঘুরে বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। কত বাবা সন্তানের হত্যার বিচার চাইতে চাইতে কবরের পাশে নীরব হয়ে গেছেন। কত মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থেকেছে। কত অপরাধী ক্ষমতা, অর্থ আর প্রভাবের আড়ালে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে।

রাষ্ট্র যখন ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, তখন অপরাধীরা সাহস পায়। তখন ধর্ষক জানে, কিছুদিন পর মানুষ ভুলে যাবে। খুনি জানে, তদন্ত ধীর হবে। প্রভাবশালী জানে, আইনের চেয়ে তার ক্ষমতা বড়। আর সাধারণ মানুষ জানে, তার কান্নার কোনো দাম নেই।

এই সমাজে আজ এক ভয়ঙ্কর অসুস্থতা জন্ম নিয়েছে। নারীর প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, ক্ষমতার অহংকার, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, সামাজিক নীরবতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মিলেই তৈরি করেছে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এখানে একজন ধর্ষক কেবল একজন অপরাধী নয়, সে একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার উৎপাদন। কারণ সে জানে, এই রাষ্ট্র ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু সবসময় বিচার করতে পারে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ আজ রাষ্ট্রকে ভয় পায় না, কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে?

কারণ মানুষ দেখছে, বড় বড় ভাষণ আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। শাস্তির ঘোষণা আছে, কিন্তু কার্যকর উদাহরণ কম। শিশুদের নিয়ে দিবস পালিত হয়, সেমিনার হয়, ব্যানার টাঙানো হয়, কিন্তু বাস্তবে শিশুদের জীবন রক্ষা করার শক্ত রাজনৈতিক সামাজিক উদ্যোগ কোথায়?

একটি দেশের সভ্যতা মাপা হয় সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে তা দিয়ে। সেই হিসাব করলে আমরা ভয়ংকর এক সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে অনেক মানুষ আজ নিজের মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। সন্তান বাড়ি ফিরতে দেরি করলে বুক কেঁপে ওঠে। কেমন দেশ, যেখানে শিশুর হাসির চেয়ে আতঙ্ক বড় হয়ে দাঁড়ায়?

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধের পর মামলা নেওয়া নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধের আগেই মানুষকে নিরাপদ রাখা। কিন্তু যখন বারবার একই ধরনের অপরাধ ঘটে, তখন ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না।

মানুষ আজ ক্ষুব্ধ। কারণ তারা অনুভব করছে, তাদের নিরাপত্তা যেন কাগজের ভাষণে সীমাবদ্ধ। তারা অনুভব করছে, তাদের কান্না কেবল সংবাদ শিরোনাম হয়ে যাচ্ছে। তারা অনুভব করছে, বিচার যেন ক্ষমতা প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই ক্ষোভকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ইতিহাস বলে, যখন মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে, তখন সমাজ ভয়ংকর অস্থির হয়ে ওঠে। তাই এখনই প্রয়োজন কার্যকর পরিবর্তন। প্রয়োজন দ্রুত স্বচ্ছ বিচার, শক্তিশালী তদন্ত, শিশু সুরক্ষায় বাস্তব পদক্ষেপ, এবং এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যা অপরাধীর মনে ভয় তৈরি করবে।

শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, এটি একটি নৈতিক সংকট।

আজ যারা ক্ষমতায়, যারা আইন প্রয়োগের দায়িত্বে, যারা বিচার ব্যবস্থার অংশ, তাদের মনে রাখা উচিত: মানুষের ধৈর্য চিরস্থায়ী নয়। একটি জাতির নীরব কান্না একসময় প্রবল প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তৃতা দিয়ে দেওয়া যায় না, দিতে হয় ন্যায়বিচার দিয়ে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ