ফিচার ডেস্ক: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৭:৫০ অপরাহ্ন
মাঠের নতুন ধান ঘরে ওঠার পর সূর্য, মাটি এবং বিশ্বাসের দেবতা মিসি সালজংয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গারো সম্প্রদায় উদযাপন করে তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ওয়ানগালা। আচিক ভাষায় ‘ওয়ানা’ অর্থ দেবতার দেওয়া দান এবং ‘গালা’ অর্থ উৎসর্গ। প্রথা অনুযায়ী, ওয়ানগালার আগে নতুন শস্য গ্রহণ নিষিদ্ধ। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চুনিয়া গ্রামের চুনিয়া বনানী আচিক (গারো) সাংস্কৃতিক ক্লাব প্রাঙ্গণে ২২ থেকে ২৪ অক্টোবর আদি সাংসারেক রীতি অনুসরণ করে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনে পূজা, ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য ও চু পানের আসর অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবটি পরিচালনা করেন পুরোহিত বা খামাল নকুল নকরেক এবং তাঁর সহকারী (মাদ্দক) এলিসন মৃ। বাংলাদেশে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর অনেক জায়গায় ওয়ানগালা কেবল দুই-এক দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে পরিণত হলেও চুনিয়া গ্রামে এখনো তিন দিন ধরে প্রাচীন ধর্মীয় রীতিনীতি অক্ষুণ্ণ রেখে উৎসবটি পালিত হয়।
উৎসবের প্রথম দিনে সূর্য ডোবার আগে শুরু হয় ‘রুগালা’ আচার। রাক্কাশি আমুয়া এবং চালের মটকার দেবতা পান রংদিক মিদ্দের পূজার মাধ্যমে এই পর্ব সম্পন্ন হয়। পূজা শেষে চাল থেকে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘চু’ পান করা হয়, যা দেবতার কাছে নতুন ধানের প্রথম অংশ উৎসর্গ করার প্রতীক।
দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় প্রধান উৎসব ‘মিসি সালজং মিদ্দের আমুয়া’ বা সূর্যদেবতার পূজা। খামালের অনুমতি নিয়ে আয়োজিত ‘গোরে রুআ’ পর্বে অংশ নেন সাইনামারী, পেগামারী, চুনিয়া, পীরগাছা ও নয়নপুর গ্রামের নারীরা। পাশাপাশি গাওয়া হয় রেরে, নাংগরিরি, আজিয়া গান এবং পরিবেশন করা হয় বিশেষ বানর নাচ ‘চাম্বল মেসা’।
অনুষ্ঠানে লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য ‘থকবিরিম সম্মাননা ২০২৬’ প্রদান করা হয় গীতিকার ও গায়ক তীরেশ নকরেক, খামাল নরেশ মৃ এবং শিশিলিয়া স্নালকে। গুণীজনদের হাতে উত্তরীয়, ক্রেস্ট ও সম্মানী তুলে দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী ও নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। এছাড়া সেরা ‘চু’ প্রস্তুতকারক হিসেবে উত্তর চুনিয়া গ্রামের সন্ধ্যা রিছিলকে পুরস্কৃত করা হয়।
তৃতীয় দিন সকালে অনুষ্ঠিত হয় বিদায়ী আচার ‘কাত্তি গালা’। এই সময় দামা, রাং, আদুরি, নাটুক ও খ্রাম বাজানো হয়। আচারের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, সব বাদককে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একই তালে ও সুরে একসঙ্গে বাদ্য থামানো নিশ্চিত করতে হয়। সবাই একতালে থামার পর খামাল মন্ত্র পাঠ করে বাদ্যযন্ত্রের কাঠি ফেলে দিয়ে আচারের সমাপ্তি ঘটান।
উৎসব শেষে সব বাদ্যযন্ত্র গ্রামপ্রধান বা নকমার বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। মোরগ ও চু দিক্কা দিয়ে পূজা করে আগামী বছরের নতুন ফসল ওঠা পর্যন্ত বাদ্যযন্ত্রগুলো নকমার ঘরে সংরক্ষণ করা হয়। বনের জমি হ্রাস ও জনসংখ্যা পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও চুনিয়ার বাসিন্দারা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী আচার বজায় রেখেছেন।
সূত্র: সমকাল

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।