সীমান্তের নীলচে জলে গোলাপি আলপনা: আখাউড়ার ঘাঘুটিয়ায় শরতের এক অলৌকিক জলকাব্য

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি ঘাগোটিয়ার পদ্মবিল বর্ষায় সেজেছে গোলাপি ও সাদা পদ্মফুলের নয়নাভিরাম সাজে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় প্রস্ফুটিত পদ্মের রূপ আর নৌকায় চড়ে ফুলের সুবাস নেওয়ার মনমুগ্ধকর অনুভূতি প্রতিদিন আকর্ষণ করছে হাজারো পর্যটককে। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল পেরিয়ে পাখির কলতান ও সবুজে ঘেরা এই শান্ত পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমী ও চিত্রগ্রাহকদের জন্য এক অপূর্ব আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
50650
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram
বর্ষার বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে আকাশে যখন শরতের অমল ধবল মেঘের খেয়া ভেসে বেড়ায়, তখন রূপসী বাংলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে এক অপরূপ রূপান্তরের পালা শুরু হয়। 
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তলাগোয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ঘাঘুটিয়া ও মিনারকোটের নিভৃত জলাভূমি এই সময়ে আর পাঁচটা সাধারণ জলাশয়ের মতো থাকে না; তা রূপ নেয় কোনো এক অলৌকিক চিত্রপটে। 
চোখের সীমানা ছাড়িয়ে যেদিকেই চোখ যায়, শুধুই সবুজের সমারোহ আর তার বুক চিরে উঁকি দেওয়া হাজার হাজার অমলিন শ্বেত ও গোলাপি পদ্ম। 
ভোরের প্রথম রোদের স্নিগ্ধ আলো যখন কালচে জলের বুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু ধারণ করে পদ্মগুলো যেন প্রকৃতির এক অনুপম রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করে।
প্রাত্যহিক জীবনের চেনা কোলাহল ও যান্ত্রিকতা ছেড়ে আসা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এ এক মায়াবী স্বর্গরাজ্য। ভোর না হতেই বিলের শান্ত জলরাশি জেগে ওঠে রূপপিপাসু ও আলোকচিত্রীদের কলতানে। 
মেহগনি বা সাল কাঠের ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে যখন কেউ বিলের বুক চিরে নীরবে গভীরে এগিয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে কোনো অচিন মায়াপুরে। কোনো পদ্ম সবেমাত্র কলি মেলে হাসছে, কোনোটি আবার পূর্ণাঙ্গ পাপড়ি মেলে সূর্যের রশ্মিকে অলৌকিক অনুরাগে আলিঙ্গন করছে।
কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলের ওপর ভেসে থাকা তরুণ পদ্মের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হয়, যেন আকাশের নীল মেঘ আর মাটির কাজল জল একাকার হয়ে গেছে এক অনন্য রূপক্যানভাসে।
প্রকৃতির এই কাব্যিক রূপবদল কেবল চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় জনজীবনের ক্যানভাসেও এঁকে দেয় এক টুকরো সচ্ছলতার চিত্র। বর্ষার জল নেমে যাওয়ার পর যেসব মাঝি কর্মহীনতার কষ্টে ভোগেন, এই পদ্ম-মৌসুমে তাদের হাতে আবার উঠে আসে বৈঠা। 
দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের বিলের গহীনে ঘুরিয়ে তারা উপার্জন করেন পরিবারের দু-মুঠো অন্নের সংস্থান। পাশাপাশি সুদূর দিগন্ত থেকে ভেসে আসা বালিহাঁস, পানকৌড়ি আর গাঙচিলের কিচিরমিচির বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশে এনে দেয় এক বিশেষ সুর ও ছন্দ। প্রকৃতি ও মানুষের এই সহাবস্থান এলাকাটিকে করে তুলেছে এক অনন্য অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক মিলনমেলা।
তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের মায়াজালের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বিষাদ ও শঙ্কার গল্প। দর্শনার্থীদের অবাধ পদচারণা, অহেতুক ফুল ছিঁড়ে ফেলার উন্মাদনা এবং ছবি তোলার নামে পদ্মগাছ উপড়ে ফেলার মতো অবিবেচক আচরণ বিলের স্বকীয়তা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। 
পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, অযথা একটি ফুল বা পাতা ছিঁড়লে তা বিলের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। একই সাথে কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশ নষ্ট হলে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে যাবে। 
প্রকৃতির এই অবিনাশী সৌন্দর্যকে আগামীর জন্য বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ, সংবেদনশীলতা ও সচেতনতা।
পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PathikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PathikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ Pathik Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PathikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ