আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ৫:৫১ অপরাহ্ন
স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত চলছে। দুর্ঘটনার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ট্রেনের চালক ও রেলওয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষের মধ্যবর্তী কথোপকথনের কিছু অডিও রেকর্ডিং স্প্যানিশ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এতে দেখা যায়, সামনের রেললাইনে একটি ট্রেন বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও পেছনের হাই-স্পিড ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে চলাচলের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল।
মাদ্রিদ থেকে সেভিলগামী একটি ট্রেন বুধবার সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অপর একটি ট্রেনকে সজোরে ধাক্কা দিলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। অডিও ফাঁসের পর দুর্ঘটনাটির আসল কারণ নিয়ে নতুন করে চরম বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, ট্র্যাজেডির প্রতিটি বিস্তারিত তথ্য উন্মোচন এবং নিরাপত্তা জোরদার করতে কর্তৃপক্ষ রাতদিন কাজ করছে।
দুর্ঘটনায় জড়িত একটি ট্রেন ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘রেনফে’ পরিচালিত, যাতে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন। এর সামনে একই লাইনে ২৫ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ‘ইরিয়ো’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেন, যার যাত্রীসংখ্যা ছিল ১৪৭। জানা গেছে, অটোমেটিক সিগন্যালিং সিস্টেমে কম্পিউটার ত্রুটির কারণে ওই ট্র্যাকে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে পরে স্পেনের পরিবহন মন্ত্রীর মতে, ‘ভুলবশত’ রেনফে ট্রেনটিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্প্যানিশ গণমাধ্যম এল পাইস ও আরটিভিই-তে প্রকাশিত অডিও রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, রেনফে ট্রেনের কারিগরি সমস্যার বিষয়টি নিয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষের অপারেটরের সঙ্গে কথা বলছিলেন চালক। ব্যাক-আপ হিসেবে ল্যাটারাল সিগন্যালিং ব্লক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে চালককে ‘স্বাভাবিক গতিতে যাত্রা চালিয়ে যেতে’ বলা হয়। চালক তা পুনরায় নিশ্চিত করতে চাইলে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ইতিবাচক উত্তর দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ইরিও ট্রেনের চালক অন্য একটি রেকর্ডিংয়ে জানান যে, তাদের ট্রেনের সিকিউরিটি সিস্টেম কাজ করছে না এবং ট্রেনটি উরদার এন্ট্রি সিগন্যালের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরে ইরিও ট্রেনের চালককে পুনরায় যাত্রা শুরুর নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি জানান যে ট্রেনটি কোনোভাবেই চালু করা যাচ্ছে না। ফলে পেছনের রেনফে ট্রেনটি দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসার সময় নিয়ন্ত্রণকক্ষ জানত যে ইরিও ট্রেনটি এখনও থমকে আছে। ইরিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ট্রেনটিকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেওয়া হয়।
স্পেনের পরিবহন মন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে কোনো ধরনের গতিসীমা নির্ধারণ না করে ট্রেন দুটিকে চলাচলের নির্দেশ দেওয়াকে ‘অব্যক্তনীয় ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে অডিও ফাঁসের এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিরোধী ও বামপন্থী নেতারা এই অডিও ফাঁসকে জঘন্য বলে উল্লেখ করার পাশাপাশি রেল খাতের বেসরকারীকরণের সমালোচনা করেছেন।
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সামনে প্রায় ১,৫০০ মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এবং পরিবহন মন্ত্রী পুয়েন্তের পদত্যাগ দাবি করেন। বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে। একই সঙ্গে রেল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে ট্রেন চালকদের সংগঠন ‘সেমাফ’ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।
ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মীরা শক্তিশালী ফ্লাডলাইটের নিচে রাতভর উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন। ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বগির ভেতর থেকে মরদেহ ও আহতদের বের করে আনা হচ্ছে। স্প্যানিশ সিভিল গার্ড জানিয়েছে, নিহতদের শনাক্ত করতে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ট্র্যাজেডি ২০১৩ সালের পর স্পেনের সবচেয়ে বড় রেল দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।