লেখা: সৈয়দ তারিক :
জাপানের এদো যুগের (১৬০৩-১৮৬৮) সাহিত্য-ইতিহাসে হাইকু কাব্যধারায় মূলত পুরুষ কবিদের আধিপত্য থাকলেও সেখানে এক উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র নক্ষত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ফুকুদা চিও-নি (১৭০৩-১৭৭৫)। কাগা নো চিও নামে পরিচিত এই কবি ছিলেন একাধারে অসাধারণ হাইকু রচয়িতা, চিত্রশিল্পী ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী। পুরুষশাসিত সমাজে তিনি তাঁর কবিতার মাধ্যমে প্রকৃতির গভীর পর্যবেক্ষণ, নারীর জীবনানুভূতির অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বচরাচরের রূঢ় বাস্তবতাকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন। বিশ্বসাহিত্যেও তিনি একজন অগ্রগণ্য নারী কবি হিসেবে স্বীকৃত।
১৭০৩ সালে জাপানের কাগা প্রদেশে (বর্তমান ইশিকাওয়া) ফুকুদা চিও-নির জন্ম হয়। তাঁর বাবা ফুকুদা মাতসুকিচি ছিলেন পটচিত্র বা স্ক্রল তৈরির কারিগর। শৈশব থেকেই শিল্প ও সাহিত্যের অনুকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। মাত্র সাত বছর বয়সে হাইকু রচনা শুরু করা চিও-নি কৈশোরে মাতসুও বাশোর কবিতার সংস্পর্শে আসেন এবং পরে বাশোর শিষ্য নাকামুরা রানের কাছে দীক্ষা নেন। সতেরো বছর বয়সের মধ্যেই তাঁর কাব্যপ্রতিভা সমগ্র জাপানে পরিচিতি লাভ করে।
চিও-নির ব্যক্তিগত জীবন ছিল ট্র্যাজেডিতে পূর্ণ। ১৭২০ সালের দিকে কানাজাওয়ার ফুকুওকা পরিবারের এক কর্মচারীকে বিয়ে করার পর তাঁর একটি সন্তান হয়, যা শৈশবেই মারা যায়। ১৭২২ সালে তাঁর স্বামীও রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই শোকেও তিনি ভেঙে না পড়ে স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে পুনরায় বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বাবা-মায়ের কাছে ফিরে পারিবারিক ব্যবসায় সহায়তা করতে থাকেন।
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ১৭৫৪ সালে ৫২ বছর বয়সে চিও-নি বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সংসার ত্যাগের উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের হৃদয়কে স্বচ্ছ জলের মতো নির্মল রাখার পথ হিসেবে তিনি এ জীবন বেছে নিয়েছিলেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি মাথা ন্যাড়া করেন, ‘সোয়েন’ নাম ধারণ করে একটি মন্দিরে বসবাস শুরু করেন এবং ‘পিওর ল্যান্ড’ নামক বৌদ্ধ ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। তবে মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত (১৭৭৫ সাল) তিনি নিয়মিত কবিতা রচনা করে গেছেন।
চিও-নির কাব্যশৈলী ছিল সরল ও অলংকারবর্জিত, যা জেনদর্শনের স্বাভাবিকতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তিনি মোট ১,৭০০ থেকে ১,৮০০টির মতো হাইকু রচনা করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত হাইকুর একটি হলো কুয়োর দড়িতে ভোরের ফুলের লতা জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে লেখা, যেখানে ফুল না ছিঁড়ে তিনি প্রতিবেশীর কাছ থেকে জল চেয়েছিলেন। প্রকৃতির প্রতি অগাধ মমতা, ক্ষণস্থায়িত্বের স্বীকৃতি এবং আত্মকেন্দ্রিকতাহীনতা তাঁর কবিতার প্রধান দর্শন ছিল।
কাব্যচর্চার পাশাপাশি চিও-নি একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী ও ক্যালিগ্রাফারও ছিলেন। ১৭৬৪ সালে তিনি তাঁর অঞ্চলের শাসক মায়দা শিগেমিচির অনুরোধে কোরিয়ান প্রতিনিধিদলের জন্য নিজ ২১টি হাইকুর ওপর ভিত্তি করে ২১টি বিশেষ শিল্পকর্ম তৈরি ও প্রদান করেন। তাঁর ক্যালিগ্রাফির রেখা ছিল কোমল, পরিশীলিত ও মুক্ত, যা তৎকালীন পুরুষ শিল্পীদের প্রথাগত শৈলী থেকে ছিল ভিন্ন। পরবর্তী প্রজন্মের নারী কবিদের জন্য তিনি এক অনন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে আজও সমাদৃত।
অথেন্টিক সোর্স: প্রথম আলো

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।