লিটন হোসাইন জিহাদ: আস্থা এমন এক অদৃশ্য সম্পদ, যার উপস্থিতি সম্পর্ককে সহজ করে এবং অনুপস্থিতি প্রতিটি কাজকে কঠিন করে তোলে। আমরা যখন কাউকে বিশ্বাস করি, তখন প্রতিটি কথার প্রমাণ চাই না, প্রতিটি প্রতিশ্রুতির পেছনে সন্দেহ খুঁজি না। কিন্তু বিশ্বাস ভেঙে গেলে একটি সাধারণ বাক্যও প্রশ্নের জন্ম দেয়। মানুষ তখন কথার চেয়ে উদ্দেশ্য, প্রতিশ্রুতির চেয়ে সম্ভাব্য স্বার্থ এবং সম্পর্কের চেয়ে তার পেছনের লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখতে শুরু করে।
একটি সমাজে আস্থা তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। পরিবারে কথা ও কাজের মিল, শিক্ষকের ন্যায্যতা, ব্যবসায়ীর সততা, জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা মানুষের মনে বিশ্বাসের ভিত্তি নির্মাণ করে। বিপরীতে প্রতারণা, পক্ষপাত, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, দুর্নীতি ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে।
আস্থা হারানোর একটি বড় কারণ হলো প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতার ব্যবধান। একজন মানুষ কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে ন্যায্য আচরণ আশা করেন। কিন্তু বারবার বিপরীত অভিজ্ঞতা পেলে তিনি আর আগের মতো বিশ্বাস করতে পারেন না। একবারের ভুল ক্ষমা করা সম্ভব, কিন্তু একই ধরনের ভুল বারবার ঘটলে তা চরিত্র বা ব্যবস্থার সমস্যার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা দিতে পারে।
ধরা যাক, একজন নাগরিক কোনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে অযথা হয়রানির শিকার হলেন। প্রথমবার তিনি মনে করতে পারেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দ্বিতীয়বার একই অভিজ্ঞতা হলে তাঁর সন্দেহ বাড়তে পারে। অন্যদের কাছেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শুনলে তাঁর মনে ধারণা জন্মাতে পারে যে সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, বরং ব্যবস্থাগত। এই ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নাও হতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি অভিযোগ শোনার ও সমাধান করার কার্যকর ব্যবস্থা না রাখে, তাহলে সন্দেহ দূর করার সুযোগও কমে যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: আস্থা মানে অন্ধ বিশ্বাস নয়। সুস্থ আস্থা এমন বিশ্বাস, যা প্রমাণ, অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যে প্রতিষ্ঠান প্রশ্নকে ভয় পায়, ভুল স্বীকার করতে চায় না এবং নিজের কাজের ব্যাখ্যা দিতে অস্বস্তি বোধ করে, সে দীর্ঘমেয়াদে আস্থা অর্জন করতে পারে না। বরং যে প্রতিষ্ঠান ভুল হলে তা সংশোধন করে, অভিযোগের জবাব দেয় এবং নিয়মের প্রয়োগে ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, তার প্রতি মানুষের বিশ্বাস গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।
ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই সত্য কার্যকর। বন্ধুত্ব, দাম্পত্য, সহকর্মিতা কিংবা সামাজিক সংগঠন—সব ক্ষেত্রেই বিশ্বাসের জন্য প্রয়োজন কথা ও কাজের সামঞ্জস্য। আমরা যখন শুধু নিজের প্রয়োজনের সময় অন্যকে স্মরণ করি, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করি না, কিংবা অন্যের দুর্বলতাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করি, তখন সম্পর্কের ভেতর অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্ব কখনো প্রকাশ্যে বিরোধে রূপ নেয়, কখনো নীরব বিচ্ছিন্নতায়।
আমাদের সমাজে ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রভাবও আস্থার সংকটকে বাড়াতে পারে। কোনো সম্পর্ক যদি কেবল সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে সুবিধা শেষ হলে সম্পর্কের গুরুত্বও কমে যায়। যে বন্ধুত্ব প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ায় না, যে সংগঠন সদস্যের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেয়, কিংবা যে সামাজিক সম্পর্ক মর্যাদার ভিত্তিতে মানুষকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করে, সেসব অভিজ্ঞতা মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন করে।
তবে সব মানুষকে একই মাপকাঠিতে বিচার করাও অন্যায়। কিছু মানুষের অসততা দেখে সবাইকে অবিশ্বাস করা যেমন ভুল, তেমনি ব্যক্তিগত সদিচ্ছার কথা বলে প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম উপেক্ষা করাও যুক্তিসংগত নয়। আস্থার সংকট বুঝতে হলে ব্যক্তির আচরণ ও ব্যবস্থার কাঠামো—দুই দিকেই তাকাতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সেখানে মানুষ মুহূর্তের মধ্যে মতামত প্রকাশ করতে পারে, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, অন্যায়ের ছবি ও তথ্য সামনে আনতে পারে। এটি গণসচেতনতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের বড় সুযোগ। কিন্তু একই মাধ্যম গুজব, বিকৃত তথ্য, বিদ্বেষমূলক প্রচার এবং অসম্পূর্ণ ঘটনার ওপর ভিত্তি করে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতাও বাড়াতে পারে।
কোনো সংবাদ যাচাই না করেই ছড়িয়ে দেওয়া, কাউকে অভিযুক্ত করে প্রমাণের আগেই দোষী ঘোষণা করা, কিংবা ভিন্নমতের মানুষকে অপমান করে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা—এসব আচরণ সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে দুর্বল করে। মানুষ তখন সত্য অনুসন্ধানের বদলে নিজের পছন্দের বক্তব্যকে সমর্থন করে এমন তথ্য খুঁজতে থাকে। ফলে একই ঘটনা নিয়ে ভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার কাজ কেবল দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করা নয়; তথ্য যাচাই, প্রেক্ষাপট তুলে ধরা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ভুল হলে সংশোধন করাও তার দায়িত্ব। একই সঙ্গে পাঠকের দায়িত্ব হলো সংবাদ ও মতামতের পার্থক্য বোঝা, একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করা এবং আবেগের বশে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা।
আস্থা কমে গেলে সমাজে সহযোগিতার খরচ বেড়ে যায়। মানুষ একে অন্যের সঙ্গে কাজ করতে দ্বিধা করে, নতুন উদ্যোগে অংশ নিতে ভয় পায়, যৌথ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে চায় না। সবাই যদি মনে করে অন্যরা নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝে না, তাহলে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, দুর্যোগ, দারিদ্র্য কিংবা স্থানীয় কোনো সামাজিক সমস্যার মোকাবিলায় মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য তাই শুধু ভালো কথা যথেষ্ট নয়। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, ভুল হলে স্বীকার করতে হবে, ক্ষমতার ব্যবহার ব্যাখ্যা করতে হবে, নিয়মের প্রয়োগে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে এবং মানুষের অভিযোগ শোনার বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে সত্যবাদিতা ও দায়িত্বশীলতা চর্চা করতে হবে; সামাজিক জীবনে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে; প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে নিয়মে পরিণত করতে হবে।
আস্থা গড়ে ওঠে ধীরে, কিন্তু ভাঙতে পারে এক মুহূর্তে। তাই এটি কোনো অলংকার নয়, যা প্রয়োজনের সময় প্রদর্শন করা যাবে। আস্থা হলো প্রতিদিনের আচরণের ফল, দীর্ঘদিনের দায়িত্বশীলতার সঞ্চয়।
আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমরা কি অন্যের কাছে যে সততা আশা করি, নিজের জীবনে তা পালন করি? যে ন্যায়বিচার চাই, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও কি তা সমর্থন করি? যে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই, সেই সত্য নিজের ভুল প্রকাশ করলে কি তা মেনে নিতে পারি?
সমাজে আস্থা ফেরানোর সূচনা অন্যকে সন্দেহ করার তালিকা থেকে নয়; শুরু হতে পারে নিজের আচরণের হিসাব থেকে। কিন্তু ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার কাজও জরুরি। কারণ একজন সৎ নাগরিকের আচরণ সমাজকে শক্তিশালী করতে পারে, আর ন্যায়সংগত প্রতিষ্ঠান সেই সততাকে টিকে থাকার পরিবেশ দিতে পারে।
বিশ্বাস ফিরে আসুক—অন্ধ আনুগত্য হিসেবে নয়, বরং এমন এক সামাজিক চুক্তি হিসেবে, যেখানে মানুষ জানবে, ভুলের জবাবদিহি হবে, সত্যের মূল্য থাকবে এবং ন্যায্য আচরণ কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, সবার অধিকার।
লেখক: সাংবাদিক ও কবি

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।