আশির দশকের শৈশবে প্রযুক্তি ও বিনোদনের রূপ ছিল আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সময়ের অমলিন স্মৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল গ্রামবাংলায় বায়োস্কোপওয়ালার আগমন। ডুগডুগি বাজিয়ে টিনের বাক্স নিয়ে উঠোনে আসা বায়োস্কোপওয়ালার বাক্সে চোখ রেখে এক রূপকথার জগতে হারিয়ে যেত ছোট শিশুরা। নগদ টাকা ছাড়াও কেবল মায়ের কাছ থেকে চেয়ে আনা ধান বা চাল দিয়েও মেটানো যেত বায়োস্কোপ দেখার আনন্দ।
বায়োস্কোপওয়ালা যখন হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ছন্দে ছন্দে বলতেন, ‘কী চমৎকার দেখা গেল, ঢাকার শহর আইসা গেল…’, তখন শিশুদের মনে তৈরি হতো এক অদ্ভুত কৌতূহল ও রোমাঞ্চ। হ্যান্ডেল ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে বাক্সের ভেতর ভেসে উঠত সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য ও নায়ক-নায়িকাদের ছবি। তখনকার সময়ে অবোধ শিশুদের কাছে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় জাদু।
এর পর গ্রামীণ জীবন ও বিনোদন জগতে আসে টেলিভিশনের প্রবেশ। গ্রামে প্রথম টেলিভিশন আসার দিনটি ছিল উদযাপনের মতো। বড় ব্যাটারি দিয়ে চালোনো ভাড়া করা টিভি দেখার জন্য গ্রামের প্রাইমারি স্কুলমাঠে ভিড় জমাত শত শত মানুষ। নারী, পুরুষ ও শিশুদের একসঙ্গের এই সমাগম পুরো এলাকাকে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করত।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়েও শহরে টেলিভিশন এত সহজলভ্য ছিল না। পুরো পাড়ায় হয়তো কেবল দু-একটি পরিবারে টিভি থাকত। শুক্রবারের বৈকালিক সিনেমা দেখার জন্য পাড়াপড়শিরা একসঙ্গে জমা হতেন ড্রয়িংরুম কিংবা উঠোনে। ছোট বাক্সের মধ্যে মানুষ কীভাবে ঢুকলো—এমন সরল ও বিস্ময়কর ভাবনা ঘুরপাক খেত তখনকার শিশুদের মনে।
একই রকম বিস্ময় জাগাত রেডিও। রেডিওর ভেতরে মানুষ বসে গান গাইছে—এমন ধারণা ছিল অনেকের। বয়োবৃদ্ধরা ঘড়ি ধরে রেডিওর সামনে বসতেন বিবিসির সংবাদ শোনার জন্য। অনেক সময় নেটওয়ার্ক স্পষ্ট না হলে এন্টেনা টেনে লম্বা করে ঘোরাঘুরির যে আকুলতা ছিল, তা প্রযুক্তির সেই সময়ের চিত্র স্পষ্ট করে তোলে।
কালের পরিক্রমায় সময় ও প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। বায়োস্কোপ, রেডিও ও সাদা-কালো টিভির আমল পেরিয়ে মানুষ এখন প্রবেশ করেছে ফেসবুক ও স্মার্টফোনের যুগে। এখন স্ক্রিনে কেবল একটি স্পর্শ করলেই সারা বিশ্বের মানুষের মুখ দেখতে পাওয়া যায়। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও প্রযুক্তির কল্যাণে বিনোদন এখন হাতের মুঠোয়।
প্রযুক্তির এই আধুনিক বিবর্তনে মানুষ অনেক আধুনিক সুবিধা পেয়েছে সত্যি, তবে আশির দশকের সেই যৌথ পরিবারের আমেজ, সহজ-সরল শৈশব এবং ধান-চাল দিয়ে বায়োস্কোপ দেখার মতো অমলিন স্মৃতিগুলো আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। হারিয়ে যাওয়া সেই বিনোদন ও যৌথ বিস্ময়ের দিনগুলো আজও অনেককে নস্টালজিক করে তোলে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।