অর্থনীতি ডেস্ক: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:২১ অপরাহ্ন
জাতিসংঘের দ্য ইন্টারগর্ভমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি কার্বন নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর গবেষক এবং সৌদি আরব সরকারের সাথে যুক্ত একাধিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু নীতি নির্ধারণী এসব প্রতিবেদন তৈরিতে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের গবেষকদের এই অংশগ্রহণ সংস্থার স্বার্থের দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইপিসিসির সপ্তম মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ওয়ার্কিং গ্রুপ ৩-এ অন্তত এক ডজন লেখক রয়েছেন যারা সৌদি আরামকো, সৌদি আরবের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা তেল ও গ্যাস খাতের স্বার্থের সাথে সরাসরি যুক্ত। ওয়ার্কিং গ্রুপ ৩ মূলত কীভাবে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন নির্গমন কমানো বা অপসারণ করা যায় এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব কেমন হবে, তা মূল্যায়ন করে। ফলে এই গ্রুপের সিদ্ধান্তসমূহ তেল উৎপাদনকারী দেশ ও কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
গার্ডিয়ানের এই অনুসন্ধানে ওয়ার্কিং গ্রুপ ৩-এর ২২৩ জন নেতৃত্বস্থানীয় লেখকের তথ্য বিশ্লেষণ করে অন্তত ২০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে জোরালো স্বার্থের দ্বন্দ্বের আশঙ্কা রয়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি ঘটনা সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, আইপিসিসির অন্যতম কোঅর্ডিনেটিং লিড অথর ড. মুস্তফা বাবিকর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সৌদি আরামকোতে কর্মরত। এছাড়া ড. দিয়েগো আরমান্দো মোয়া পিন্টা নামের অপর এক লিড অথর ২০২২ সাল থেকে আরামকোতে কর্মরত থাকলেও আইপিসিসির নথিতে তাকে কেবল ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সাথে যুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এছাড়াও, এই গ্রুপে সৌদি সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘কিং আবদুল্লাহ পেট্রোলিয়াম স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ (ক্যাপসার্ক)-এর পাঁচজন লেখক রয়েছেন। কিংস ফাহাদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস এবং কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরাও যুক্ত আছেন, যারা আরামকোর সরাসরি অর্থায়ন বা যৌথ গবেষণায় কাজ করছেন। জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় তেলভিত্তিক অর্থনীতি রক্ষা ও কার্বন ক্যাপচারের মতো বিকল্প প্রযুক্তি জোরদারের কৌশলের অংশ হিসেবেই সৌদি বিশেষজ্ঞদের এই আধিপত্যকে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আইপিসিসির নেতৃত্ব পর্যায়ের দায়িত্বেও রয়েছেন সৌদি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সংস্থাটির ওয়ার্কিং গ্রুপ ৩-এর সাতজন ভাইস-চেয়ারের একজন ড. মালেক আল-নুরি, যিনি একই সাথে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি চলতি বছরের জুন মাসে বনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে সৌদি আরবের সরকারি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন। একজন নিরপেক্ষ পর্যালোচক এবং একই সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে তার এই দ্বৈত ভূমিকা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিবেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা আইপিসিসির বর্তমান নিয়মকানুনকে অপर्याপ্ত ও কার্যকারিতাহীন বলে অভিহিত করেছেন। ইনস্টিটিউশনাল ইন্টারগ্রিটি ও জলবায়ু প্রচারণায় যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও আরামকোর কর্মকর্তাদের যুক্ত থাকার পরও কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে সংস্থার সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। তাছাড়া লেখকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্যের ঘোষণাপত্র জনসম্মুখে প্রকাশ না করা এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা না থাকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রতিনিধিরা।
তবে আইপিসিসির এক মুখপাত্র সমস্ত অভিযোগ ও সংশয়কে নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছেন যে, লেখকদের দ্বারা সম্ভাব্য যেসব স্বার্থের দ্বন্দ্বের কথা রিপোর্ট করা হয়েছিল, তা ওয়ার্কিং গ্রুপের ভাইস-চেয়ারদের মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইপিসিসির মূল শক্তি হলো বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ এবং তাদের কাজের ওপর বহুস্তরের বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা। একক কোনো লেখক, প্রতিষ্ঠান বা দেশ আইপিসিসির প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারে না এবং প্রতিটি ধাপের পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা হয়।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।