ঝুঁকিতে মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি

Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা : শীতলক্ষ্যা নদীর শান্ত স্রোত আজও বয়ে চলে মুড়াপাড়ার পাশ দিয়ে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক দালান যেন নীরবে তাকিয়ে থাকে সময়ের দিকে। লালচে ইট, খসে পড়া দেয়াল আর ছাদ ফুঁড়ে ওঠা অযত্নের গাছ সব মিলিয়ে মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি দিনে দিনে ইতিহাসের এক বিষণ্ন প্রতিচ্ছবিতে রূপ নিচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়ায় অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটি কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলার জমিদারি যুগের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। সবুজ-শ্যামল মুড়াপাড়া গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদ একসময় ছিল ক্ষমতা, প্রভাব আর ঐশ্বর্যের প্রতীক। আজ তা দাঁড়িয়ে আছে অবহেলা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে।

ইতিহাসের পাতায় মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি:

ইতিহাস থেকে জানা যায়, নাটোরের রাজার বিশ্বস্ত কর্মচারী বাবু রামরতন ব্যানার্জীর হাত ধরেই মুড়াপাড়ায় জমিদারির সূচনা। সততার পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত জায়গিরে ১৮৮৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এই জমিদারি। পরে তার ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী জমিদারির পরিধি আরও বিস্তৃত করেন।
১৯০৯ সালে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীর মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী জমিদার বাড়িটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন এলাকার একজন প্রভাবশালী জমিদার। জমিদারি শাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠে এই বিশাল প্রাসাদ।

স্থাপত্যে ঐশ্বর্য, বিন্যাসে বুদ্ধিমত্তা:

প্রায় এলাকায় ৫২ বিঘা জমির ওপর এই প্রকাণ্ড জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। ১৭৮ বছর আগে নির্মিত বিশাল দোতলা এ জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। এর মধ্যে শোয়ার ঘর, দরবার হল, নাচঘর, আস্তাবল, উপাসনালয়, ভাণ্ডার, কাচারি ঘর উল্লেখ যোগ্য।

বিশালাকৃতির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভেতরে। অন্দর মহলে রয়েছে আরও ২টি ফটক। সর্বশেষ ফটক পেরিয়ে মেয়েদের গোসলের জন্য ছিল শানবাঁধা পুকুর। পুকুরের চারধার উঁচু দেয়ালে ঘেরা। এখানে প্রবেশ বাইরের লোকদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাড়ির সামনে রয়েছে আরও একটি বিশাল পুকুর। পুকুরটির চারদিক নকশি কাটা ঢালাই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা, যার চারদিকে চারটি শানবাঁধানো ঘাট। মূলত এ পুকুরটি তৈরি করা হয়েছিল বাড়ির সৌন্দর্যবর্ধন এবং পুরুষ মেহমানদের গোসলের জন্যই।

সদর দরজার সামনে দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী। সে সময় যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল নৌ-পথ। সে কথা মাথায় রেখেই বোধহয় বাড়িটি নদীর তীর ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছিল। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা দুই তলা একটি দালানকে কেন্দ্র করে বিশাল আয়তনের এই বাড়ি। হাতের বামে দুটি মন্দির। তার পেছনেই বিশাল আম বাগান। প্রান্তর পেরিয়ে গেলে বাঁধানো চারটি ঘাট বিশিষ্ট একটি পুকুর।

পুকুরের সামনেই খোলা সবুজ মাঠ। মাঠে আম বাগান ও সারি সারি ঝাউ গাছ। বাড়ির মূল ভবনের পেছনে পাকা মেঝের একটি উঠান। উঠানটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এর চারপাশ দ্বিতল দালান বেষ্টিত। উত্তর পাশেরটি অন্দর মহলের মন্দির। ভবনের এই অংশের পেছনেও আছে আরেকটি দালান। এদিকে বাড়িটির সামনে পেছনে ঘাট বাঁধানো পুকুর জমিদার বাড়ির পরিবেশকে করেছে আরও সুন্দর। নান্দনিক এবং কারুকাজপূর্ণ যা অন্যতম স্থাপত্যশৈলীর ধারক।

দেশভাগের পর বদলে যাওয়া নিয়তি:

১৯৪৭ সালের দেশভাগ মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির ইতিহাসে বড় এক বাঁক। জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী দেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। একসময় যেখানে জমিদারি শাসনের কেন্দ্র ছিল, সেখানে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন সরকার চালু করে হাসপাতাল ও কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র।
পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। স্বাধীনতার পর ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। বর্তমানে এটি সরকারি মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সংরক্ষণের অভাবে আজ বিপন্ন ঐতিহ্য:

সময় বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি অবহেলার চিত্র। ছাদে ফাটল, দেয়ালে ধস, জানালার কাঠ ভেঙে পড়ছে। প্রতিটি কক্ষে গাছের শিকড় ঢুকে পড়েছে। ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা গাছ যেন ইতিহাসের বুক চিরে ওঠা আর্তনাদ।
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সংস্কারের জন্য আমরা একাধিকবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। ভবনের কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে যেহেতু ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে, তাই সরাসরি সংস্কার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি আরও জানান, ‘পাশেই আটতলা একটি নতুন ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। সেটি শেষ হলে কলেজের কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তর করা হবে। তখন ঐতিহাসিক ভবনটি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয়দের ক্ষোভ:

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, ‘বাইরের দেয়াল রং করে সাজানো হলেও ভেতরের অবস্থা ভয়াবহ। নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র, নেই কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ।

তাদের মতে, মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হতে পারত।

ইতিহাসপ্রেমিদের অভিমত:

ইতিহাসপ্রেমীরা মনে করেন, ইতিহাস সংরক্ষণ মানে শুধু অতীত আঁকড়ে ধরা নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তোলা। একটি জাতি যখন তার স্থাপত্য, সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন হারায়, তখন সে নিজের শেকড় হারায়। মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির মতো স্থাপনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানিয়ে দেয়—এই ভূখণ্ডে মানুষ কীভাবে বাস করত, কীভাবে সমাজ ও ক্ষমতার কাঠামো গড়ে উঠেছিল এবং নদী কীভাবে জীবনের কেন্দ্র ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে:

মুড়াপাড়া জমিদার বাড়িকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দ্রুত পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী। কারন এটি কেবল একটি ভবন নয়, বরং বাংলার জমিদারি ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। তাই বাড়িটি উদ্ধারে দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু না হলে এই স্থাপনা একদিন কেবল ইতিহাসের পাতায় ছবি হয়েই রয়ে যাবে। আর তখন দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না কারও।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ