তারেক জিয়া: শক্ত মানুষের একাকী গল্প

Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

 লিটন হোসাইন জিহাদ: ভোরবেলা পৃথিবী খুব ধীরে কথা বলে। আলো তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠে না, শব্দগুলোও সাবধানে হাঁটে। এই সময়টাতে মানুষের ভেতরের দুঃখগুলো সবচেয়ে স্পষ্ট হয়। কারণ তখন আর কিছু লুকানোর থাকে না। তারেক জিয়ার জীবনটাও আজ এমন এক দীর্ঘ ভোর। বাইরে নানা কোলাহল, ভেতরে জমে থাকা নীরবতা। যে নীরবতা কথা বলে না, কিন্তু সব কিছু বলে দেয়।
তারেক জিয়ার শৈশব ছিল অস্বাভাবিকভাবে সংক্ষিপ্ত। যে বয়সে একটি ছেলে বাবার আঙুল ধরে পৃথিবী চিনতে শেখে, ঠিক সেই সময়েই তিনি বাবাকে হারান। পিতা হলো একটি ছায়া, একটি দিকনির্দেশ, একটি অবলম্বন। বাবাহারা হওয়া মানে হঠাৎ করে পৃথিবীটা বড় হয়ে যাওয়া, আর নিজেকে খুব ছোট মনে হওয়া। এই শূন্যতা কখনো পূর্ণ হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু তার আকৃতি বদলায়। শৈশবে যা ছিল ভয়, যৌবনে তা হয়ে ওঠে দীর্ঘশ্বাস।
বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তারেক জিয়ার জীবনে স্বাভাবিকতার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আর দশজন সাধারণ সন্তানের মতো বড় হতে পারেননি। তাঁর প্রতিটি দিন ঘিরে ছিল ইতিহাসের ভার, রাজনীতির চাপ, আর মানুষের প্রত্যাশা। অথচ এসবের আড়ালে তিনি ছিলেন একজন ছেলে, যিনি বাবার অভাব প্রতিদিন অনুভব করতেন। কিছু শোক আছে যেগুলো প্রকাশ্যে আসে না। সেগুলো মানুষের চোখে নয়, মানুষের ভেতরে বাস করে।
সময়ের স্রোত আর রাজনীতির প্রতিহিংসা তাকে হতে হয় নিবার্সিত। নিজের দেশ থেকে দূরে থাকা মানে শুধু মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, এটি স্মৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো। নিজের ভাষা, নিজের গন্ধ, নিজের আকাশ—সবকিছু একসঙ্গে হারানোর অনুভূতি। প্রবাসে মানুষ শক্ত দেখাতে শেখে, কারণ দুর্বল হলে কেউ দেখে না।

নিবার্সিত জীবনে ভাই হারানোর খবর হয়তো পাঁজর ভাঙা কষ্ট অনুভব হয় তারক রহমানের। ভাই মানে শৈশবের সঙ্গী, একই ছাদের নিচে বড় হওয়া আরেকটি জীবন। সেই জীবনটি হঠাৎ থেমে যায়, আর তিনি দূরে বসে শুধু শুনতে পারেন। না ছুটে যাওয়ার সুযোগ, না শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখার অধিকার। কিছু মৃত্যু আছে, যা মানুষকে আজীবন প্রশ্ন করে। “আমি কি কিছু করতে পারতাম?” এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, আছে শুধু অপরাধবোধের মতো এক নীরব ভার।
এই সব কষ্টের মাঝখানে একজন ছিলেন, যিনি তারেক জিয়ার জীবনে শেষ পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর মা। মা মানে পৃথিবীর শেষ আশ্রয়। রাজনীতি, বিতর্ক, মামলা, নির্বাসন—সব কিছুর পরেও মায়ের কণ্ঠে ছিল নিরাপত্তার অনুভূতি। একজন মা সন্তানকে শুধু ভালোবাসেন না, তিনি তাকে বিশ্বাস করেন। সেই বিশ্বাসই মানুষকে ভেঙে না পড়তে সাহায্য করে।
মায়ের অসুস্থতা, দূর থেকে পাওয়া খবর, উদ্বেগের দীর্ঘ রাত—এই অভিজ্ঞতাগুলো তারেক জিয়ার জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। তিনি জানতেন, সময় খুব নিষ্ঠুর। তবুও আশা ছিল, হয়তো শেষ পর্যন্ত তিনি মায়ের পাশে থাকতে পারবেন। কিন্তু সময় সেই সুযোগও দেয়নি। মায়ের মৃত্যু মানে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই শোকের কোনো ভাষা নেই। এটি শুধু নীরবতা হয়ে থাকে।
আজ তারেক জিয়ার বর্তমান অবস্থা কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিষয় নয়। এটি একজন মানুষের মানসিক মানচিত্র। যেখানে প্রতিটি মোড়ে একটি করে ক্ষত। বাবা, ভাই, মা—এই তিনটি সম্পর্ক মানুষের জীবনের মূল স্তম্ভ। এই তিনটি স্তম্ভ একে একে ভেঙে পড়লে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে আর আগের মানুষ থাকে না। তখন হাসি আসে অভ্যাস থেকে, কথা আসে দায়িত্ব থেকে, আর নীরবতা আসে বাস্তবতা থেকে।
অনেকেই তাকে শুধু রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখেন। কিন্তু রাজনীতির বাইরেও একটি জীবন থাকে। সেই জীবনে থাকে রাতের একাকীত্ব, স্মৃতির ভার, আর কিছু না বলা কষ্ট। ক্ষমতা বা পরিচয় কোনো মানুষকে শোক থেকে রক্ষা করতে পারে না। বরং অনেক সময় এগুলো শোককে আরও গভীর করে তোলে, কারণ তখন কাঁদার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
তারেক জিয়ার দুঃখ কষ্ট তাকে হয়তো আরও সংযত করেছে। তিনি কথা কম বলেন, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে অনেক গল্প জমে আছে। এসব গল্প প্রকাশ্যে আসে না। আসে গভীর রাতে, আসে স্মৃতির ভিড়ে, আসে মায়ের কণ্ঠের কল্পনায়। কিছু মানুষকে জীবনের ভার একা বহন করতে হয়। কারণ তাদের জীবন শুধু তাদের নিজের নয়।
এই লিখাটি কোনো পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে লেখা নয়। এটি একটি মানবিক পাঠ। মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে পারে, কিন্তু শোকের ভাষা সবার এক। একজন মানুষ যখন বাবাকে হারায়, ভাইকে হারায়, মাকে হারায়—তখন সে শুধু একজন মানুষ হয়ে যায়। তার পরিচয়ের সব স্তর তখন গৌণ হয়ে পড়ে।
তারেক জিয়ার জীবনের এই দীর্ঘ দুঃখগাথা আমাদের একটি কঠিন সত্য শেখায়। ইতিহাস যাদের সামনে দাঁড় করায়, তাদের পেছনের জীবনটি প্রায়ই অবহেলিত থাকে। আমরা মঞ্চ দেখি, কিন্তু পর্দার আড়ালের মানুষটিকে দেখি না। অথচ সেই মানুষটিই সবচেয়ে বেশি কষ্ট বহন করে।
ভোরের মতোই এই গল্পের কোনো হঠাৎ আলো নেই। আছে ধীরে আসা উপলব্ধি। জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইগুলো রাজনীতির মাঠে নয়, মানুষের নিজের ভেতরে ঘটে। আর সেই লড়াইয়ে জয় মানে সুখ নয়, শুধু টিকে থাকা।
তারেক জিয়া আজও টিকে আছেন। স্মৃতির ভার নিয়ে, নীরবতার সঙ্গে বসবাস করে। হয়তো এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। হয়তো এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—একজন নীরব মানুষ, যিনি অনেক কিছু হারিয়েও দাঁড়িয়ে আছেন।

মানব জীবনের অনেক ঘটনায়, আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি মানুষকে তার অবস্থান দিয়ে বিচার করব, নাকি তার অনুভূতি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করব। তারেক জিয়ার জীবন দেখায়, ক্ষমতা, পরিচিতি বা বিতর্ক কোনো কিছুই মানুষকে ব্যক্তিগত শোক থেকে মুক্তি দিতে পারে না। বরং অনেক সময় এসবই শোককে আরও নীরব করে তোলে।
মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে নয়। রাজনৈতিক আলোচনা চলবে, সমালোচনা হবে, ইতিহাসের হিসাবও লেখা হবে। তবে ব্যক্তিগত ক্ষতির মুহূর্তে সংযম, সহানুভূতি এবং মর্যাদা বজায় রাখা একটি পরিণত সমাজের পরিচয়।
মানুষ হিসবে আমাদের উচিত —শোককে উপলব্ধি করা, নীরবতাকে সম্মান করা, এবং ভিন্ন মতের মাঝেও মানবিক অবস্থান ধরে রাখা। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস শুধু শক্তির নয়, সহমর্মিতার পরীক্ষাও নেয়

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ