কামরুল হুদা পথিক : “অমরত্ব চাই না ভালোবাসা চাই” ঠিক এরকম এক ক্কুদ্র বাক্যের নিগূঢ় অভিব্যক্তি ব্যাক কভারে লিখে রেখে ২০২৫ সালে অমর একুশে বই মেলায় “মানুষ কামড়ে মানুষ বাঁচে” প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করার অভিপ্রায় পূর্ণ করে তিতাস পাড়ের আমার অনুজপ্রতিম কবি তারিকুল ইসলাম। তিতাস ও মেঘনা পাড়ের নদীবর্তি ভূমিজলে সিক্ত হয়ে খুবই সচেতনভাবে নিজের ভাণ্ডারে জমা করেছে প্রকৃতি মানুষ রাষ্ট্র সামাজ এমনকি বিশ্বব্যবস্থাপনার কদাকার চিত্রভাষা। তারিকুল তার বুকের অলিন্দে পুষে রাখছে তার প্রেমিকার মিষ্টি ভোরের মত স্নিগ্ধ আকাঙ্ক্ষা আবার একই সাথে মানুষ কামড়ে মানুষ বাঁচার কণ্টকাকীর্ণ ও নষ্ট-ভ্রষ্ট পথ পর্যবেক্ষণ করে নিজের দৃষ্টিকেই রক্তাক্ত করেছে। সেরূপ এক দ্বৈত দৃষ্টির এক সংশ্লেষণকে একসাথে মার্চ করিয়ে এক কবিতার পাশে অপর কবিতা বা এক কবিতার মাঝেই দ্বৈত গল্পকে তুলে ধরে কবির নিজস্ব আকাঙ্ক্ষাকে চিত্রময় করার প্রয়াস পেয়েছে কবি তারিকুল ইসলাম। যেমন,
রাতের স্রোত ঠেলে নক্ষত্রের নাকফুল চুরি করে কবি অতল হতে উঠে আসে
তোমার ধ্যানমগ্ন চোখের কাজলে যে অপার মুগ্ধতা
-(কবির চাওয়া)
অন্যদিকে,
আর আমরা সাধারণ-অতি সাধারণ, মধ্যবিত্ত-অর্ধবিত্ত, কৃষক-শ্রমিক, তাঁতি-জেলে
আমাদের মানুষজন্মের হাহাকার নিয়ে মানুষ কামড়ে বেঁচে থাকার সমীকরণ আঁকি।
-(আমাদের জীবননামা)
তারিকুলের সাথে আমার পরিচয় অন্তত এক যুগ তো হবেই। ভৈরব বন্দরে নদী ঘেঁষে তার মেসবাসায় (চাকরী সূত্রে) বার কয়েক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো শুধু কবিতার ভালোবাসা থেকেই। ভৈরব নদী বন্দরটা আমাকেও খুব টানে। তার সন্ধ্যাকালীন নৌ-বন্দরের ব্যস্ততার এক রহস্যময় চিত্রকল্পকে খুব নিকট থেকে দেখার লোভ আছে এখনও। যদিও সে এখনও সেভাবে যাওয়া হয়নি। তারিকুল ততদিনে জীবিকার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে তার বাসস্থান পরিবর্তন করে। কবিতার প্রতি তার এক ধরনের গভীর টান, টান থেকে লেখার ইচ্ছে, ইচ্ছে থেকে কবিতা হয় কি না দ্বিধা, দ্বিধা থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা, এই করে করেই বহু বছর পার, তার মধ্যে আমার সাথে কবিতা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন আর উত্তরের চালাচালি হয় ফোনে কিংবা মেসেঞ্জারে। তারিকুল নিজের লেখার প্রতি নিজেরই সংকোচ, আস্থাহীনতা নিয়ে অনেকটুকু পথ হেঁটেছে। আর তাই যখন তার প্রথম গ্রন্থকে আলোর সামনে উন্মোচন করেছে তখনও ঠিক ব্যাক কভারের ফ্ল্যাপে আত্মপরিচয়কে গোপন রেখেই লিখে দিয়েছে মাত্র একটি ও অসাধারণ বাক্য, যা হলো-
“পরিচয় উদ্ধারে অনুসন্ধানমূলক কাজ অব্যাহত আছে, খনন কাজ শেষ হলে আমার সেই কাঙ্ক্ষিত পরিচয় কোনো এক ধূসর পাণ্ডলিপি থেকে হয়তো-বা পেয়ে যাবো।”
অর্থাৎ কবি আত্মপরিচয়কে প্রকাশ্যে আনার জন্য লোভী নয়, তার কাজই তার পরিচয় উন্মোচন করুক কোনো সময় সে অভিপ্সায় আত্মগোপনেই থাকতে চেয়েছে আর কবির প্রেম কিংবা ব্যর্থ প্রেম যাই হোক, তার প্রতি অসম্ভব দৃঢ়তায় প্রথম কভারের ফ্ল্যাপে লিখেছে,
“সংবিধানের মৌলিক অংশে লেখা থাকবে ব্যর্থ প্রেম
কখনো মেয়াদোত্তীর্ণ অমরত্ব চাই না।
ভালোবাসা চাই, চাই এক তরফা ভালোবাসার নাগরিক অধিকার।”
“মানুষ কামড়ে মানুষ বাঁচে” কবি তারিকুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু প্রথম কাব্যগ্রন্থেই সে তার আগমন বার্তাকে স্পষ্ট করতে পেরেছে, সে তার কবিতার বিষয়, কবিতার শব্দ বাক্য আর অলঙ্কারের বিন্যাস, একই সাথে কবিতায় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট, বিশ্ব অব্যবস্থাপনার প্রতি তীর্যক বাক্যবাণে। কবি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্যের আশ্রয় নেয়নি, লম্বা বাক্য এবং আয়তনিক দিকটাও কোনোভাবেই নাতীদীর্ঘ না করে। কিন্তু সেসবের মাঝে কবি উপমা ও চিত্রকল্প নির্মাণ ও প্রয়োগে অত্যন্ত মনযোগী ছিলো। তাই তার কবিতায় ব্যক্তি থেকে বিশ্বে, প্রেম থেকে সংগ্রামে, ভালোবাসা থেকে আক্রমণে উল্লম্ফন করেছে। সেরকম কিছু কবিতার সাথে পরিচয় হওয়া যাক,
১।
আমাদের রাষ্ট্র বিচারব্যবস্থা তার উলঙ্গ শরীর নিয়ে লুকিয়ে পড়ে লজ্জাবতী গাছের ঝোপে।
-(লালসাক্ত চোখ)
২।
আমাদের এই হয়েছে যা, শুদ্ধতম চিন্তার সেতু,
সেই কবেই ভেঙ্গে পড়েছে অটিজম সভ্যতার মাথার উপর।
-(অটিজম সভ্যতা)
৩।
ঐ যে দূরতম দ্বীপ থেকে ছেড়ে আসা জাহাজের নাবিক জানে
মৃত্যুর সাথে তার যে সন্ধি হয়েছে তা যে-কোনো জরুরি সভার ডাকে ভেঙ্গে যেতে পারে।
-(জরুরি সভার ডাক)
৪।
পৃথিবীর সকল সাহিত্য গিলে খেয়েছে কুমিরের দল
(অথবা)
ট্রেন এগোচ্ছে! বিপ্লবে অগ্নিপতি পুঁজিবাদীরা কেমন হাসছে
আর ঐ দিকে চেয়ে দেখো একদল কবি, একদল বিপ্লবী, একদল বৈজ্ঞানিক আর,
একদল দার্শনিক কেমন গবেষণালব্ধ ধ্যানে স্থবির হয়ে আছে।
-(মুখোশের আড়ালে)
৫।
সে সাথে সংবিধান সৎ মায়ের আঁচলের মতো নিরাপদ হয়ে উঠে আমাদের জীবনে
তখন ধুঁকতে থাকা অগ্নিকুণ্ড কুণ্ডলি পাকিয়ে ছড়িয়ে পড়ে নগরীর পথে পথে।
-(কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা আমাদের সমাজের শরীর)
৬।
এমন একটা মেয়ে চাই?
সে যদি রাগ করে টিপ না পড়ে
চোখে কাজল না দেয়!
সেদিন আকাশে চাঁদ উঠবে না
অভিমান করে মেঘও দূর দেশে পাড়ি দিবে।
যদি এমন একটা ভাঙ্গা-গড়া দস্যি মেয়ে পেয়ে যাই
হুট করে বলে দিব ভালোবাসি!
৭।
আমি বেদনার নগ্নডালে দুর্ভিক্ষের ন্যায় মাংসভুক নেকড়ের মত পৃথিবীতে বাঁচতে চাই না
আমি আমার জন্মের কাবাতে ফিরতে চাই
এই পথ চলা শেষ হলে
আমি ফিরে যাবো।
অসম প্রতিযোগিতার দৌড়ে আমি দর্শনার্থী হতে চাই না।
-(অসম প্রতিযোগিতার দর্পন)
কবি তারিকুল ইসলাম একজন নবীন কবি। নিভৃতেই বিচরণ করে, ঘুরে ফিরে বেড়ায় আর অনুসন্ধান করে কবিতার বিষয় আশয়। কবিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানার বোঝার কৌতুহল প্রবন কবির মননে সাম্রাজ্যবাদী দুঃশাসনের বিপরীতে সম্পদের সমবন্টনের এক দর্শনের ছায়ার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে শ্রমজীবী মানুষের জয়গান তার কবিতায় স্পষ্ট। কবি নষ্ট ভ্রষ্ট সমাজপতিদের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয় তার সাধারণ নাগরিকদের দাবীনামা। সেজন্যই কবি লিখতে পারে,”শতবছর পরে ওরা যদি কয়লার খনিতে ভেসে উঠে/ তবে এক জন্মের পাপ বহু জন্ম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাক”, কিংবা, “চৈতন্যশূন্য আমাদের প্রভুরা রাত গভীর হলে পৃথিবীতে অবতরণ করেন অধ্যুষিত রাজনীতির বিকলাঙ্গ সংখ্যাতত্ত্ব”, কিংবা ” অত:পর আমাদের সভ্যতার নাক ঘষে নেমে আসে মানবতা/ ছড়িয়ে পড়ে আমাদের স্বামীভক্ত সমাজের”।
তিতাস পাড়ের কবিকূলে কবি তারিকুল ইসলাম নবাগত। তবে সাহিত্যের সাথে তার বোঝাপড়া নতুন নয়। তাই অনেক ভেবেচিন্তেই তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “মানুষ কামড়ে মানুষ বাঁচে” নিয়ে নিজেকে প্রকাশ্যে আনলো এবং জানান দিলো। কবির এই কাব্যগ্রন্থ তিতাস পাড়ের কবিকূলে যেনো এক বার্তা নিয়েই প্রকাশ পেলো। আমার বিশ্বাস কবি তারিকুল ইসলাম-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থটি পাঠে এ অনুভব আসতে বাধ্য। কারণ কাব্যগ্রন্থটিতে মৌলিক চিন্তার যোগ রয়েছে, আছে নিজের মাটির নিজের আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার এবং কবিতার বিষয় ও শব্দ বিন্যাসে, উপমা ও চিত্রকল্প নির্মাণে যথেষ্ট চিন্তার সূত্রপাত ঘটাতে সক্ষমতা। “মানুষ কামড়ে মানুষ বাঁচে” কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৫৯টি কবিতা রয়েছে, গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে হরিতপত্র প্রকাশনী। বিনিময় মূল্য রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা।
কাব্যগ্রন্থটিতে কিছু আঞ্চলিক শব্দের প্রমাদ ও বানান বিভ্রাট শুদ্ধ করে নিলে এবং সম্পাদনায় কিছু কবিতা বাদ দিলে গ্রন্থটি আরও পূর্ণতা পেতো বলে আমি মনে করি। অনুজ কবি তারিকুল ইসলাম ও তার কাব্যচর্চা অব্যহত থাকবে এবং তার এই রাষ্ট্র ও সমাজ মনষ্ক নিজস্ব প্রগতিশীল চিন্তার প্রয়োগে আরও গভীর মনোনিবেশ সক্রিয় থাকবে এই প্রত্যাশা করি।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।