দেশে দেশে জেন-জি বিক্ষোভ: সময় এখন জাগ্রত তারুণ্যের

Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

বিশ্বের প্রতিটি যুগে এক একটি প্রজন্ম আসে নতুন প্রশ্ন, নতুন প্রতিবাদ ও নতুন পথের দিশা নিয়ে। আজকের পৃথিবীতে যে প্রজন্ম সবচেয়ে আলোচিত, সর্বাধিক সক্রিয় এবং একইসাথে সবচেয়ে বৈপরীত্যপূর্ণ—তারা হলো জেনারেশন জি (Gen Z), অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া তরুণেরা। প্রযুক্তি ও তথ্যের যুগে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম এখন পৃথিবীর প্রতিটি কোণে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও সামাজিক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। পরিবেশ, লিঙ্গসমতা, ন্যায়বিচার, যুদ্ধবিরোধ, রাজনৈতিক দুর্নীতি, কৌটা সংস্কার আন্দোলন—সবক্ষেত্রেই তাদের দৃপ্ত উপস্থিতি বিশ্ববাসীকে নাড়া দিচ্ছে। প্রশ্ন জাগে—কেন এই প্রজন্ম এত রাগান্বিত, এত সচেতন, এবং এত সাহসী?

জেন-জি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে এমন এক বিশ্বে যেখানে তথ্যপ্রবাহের কোনো সীমা নেই। ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার (এক্স)—এই মাধ্যমগুলো তাদের হাতে দিয়েছে এক বিশাল চোখ, যার মাধ্যমে তারা দেখতে পাচ্ছে—পৃথিবী কতটা অসম। একদিকে বিলিয়ন ডলারের টেক কর্পোরেশন, অন্যদিকে অনাহারে থাকা শিশু; একদিকে ধনীদের বেহিসেবি বিলাসিতা, অন্যদিকে জলবায়ু বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত কৃষক। এই বৈষম্যের চিত্র তাদের ভেতরে সৃষ্টি করেছে গভীর অসন্তোষ।

তারা দেখছে, বিশ্বব্যবস্থা  কেবলই ধনীদের জন্য কাজ করে, আর রাজনীতি ক্রমেই হারাচ্ছে মানবিকতা। তাই তারা রাস্তায় নামে—কখনও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে গ্রেটা থানবার্গের নেতৃত্বে, কখনো কৌটা সংস্কারের নামে ভিপি নূরু ও নাহিদদের নেতৃত্বে, কখনও গাজায় শিশু হত্যার প্রতিবাদে, কখনও কৃষক আন্দোলনের পাশে, কখনও আবার বর্ণবৈষম্যবিরোধী “Black Lives Matter” আন্দোলনে। তাদের প্রতিবাদ কেবল দেশীয় নয়, গ্লোবাল সংহতির প্রতীক

জেন-জি প্রজন্মের রাগ মূলত অন্যায়ের প্রতি শূন্য সহনশীলতা থেকে জন্মেছে। তারা এমন এক সময় বড় হয়েছে যখন তথ্য লুকানো অসম্ভব—একটি অন্যায় মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। পুলিশি বর্বরতা, নারী নির্যাতন, যুদ্ধ, পরিবেশ ধ্বংস—সবকিছু তাদের সামনে বাস্তব চিত্র হয়ে ধরা দেয়। ফলে তারা আর নীরব থাকে না।

তাদের রাগ যুক্তিসম্মত এবং বিশ্লেষণধর্মী—এটি অন্ধ ক্ষোভ নয়, বরং নৈতিক প্রতিবাদ। এই প্রজন্ম আর ‘প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি ভক্তি’ শেখে না, বরং তারা শেখে প্রশ্ন করতে। ফলে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও কর্পোরেট শক্তির মুখোশ উন্মোচনে তারা ভয় পায় না।

তাদের প্রতিবাদ কেবল রাগের প্রকাশ নয়—এর পেছনে আছে গভীর ভালোবাসা। এই ভালোবাসা দেশের প্রতি, মানবতার প্রতি, এবং প্রকৃতির প্রতি। জেন-জি প্রজন্ম জলবায়ু আন্দোলনে অংশ নেয় কারণ তারা জানে—এখন নীরব থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শ্বাস নিতে হবে কৃত্রিম অক্সিজেনে। তারা লিঙ্গসমতার কথা বলে, কারণ তারা বোঝে ভালোবাসা মানে সম্মান ও সমতা।
তারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে শান্তিই সভ্যতার সর্বোচ্চ অর্জন।

এই প্রজন্মের ভালোবাসা তাই সীমাহীন ও আন্তর্জাগতিক—তারা জাতীয় সীমানার বাইরে গিয়ে মানবিকতার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছে।

জেন-জিরা কোনো একক মতবাদে বিশ্বাসী নয়। তারা ডান-বাম রাজনীতির প্রচলিত বিভাজন ভেঙে ফেলছে। তাদের কাছে সত্য ও মানবিকতা সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ। তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অধিকার মনে করে, এবং ভণ্ডামি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। তাদের ভাষা ডিজিটাল, কিন্তু চিন্তা গভীর। তারা মিম দিয়ে যেমন প্রতিবাদ করে, তেমনি বিশ্লেষণাত্মক ভিডিও বানিয়ে প্রমাণও উপস্থাপন করে।

তারা ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রশ্নে নতুন এক বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলছে, যার মূল লক্ষ্য হলো ন্যায় স্বাধীনতা, কোনো পক্ষ নয়।

এই প্রজন্মের জাগরণ কেবল একধরনের তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ নয়—এটি এক দীর্ঘস্থায়ী চেতনার বিবর্তন
তাদের প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে—

  • পৃথিবীব্যাপী পরিবেশনীতি কঠোর হচ্ছে,
  • কর্পোরেট কোম্পানিগুলো “সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি”তে বাধ্য হচ্ছে,
  • রাজনীতিবিদরা তরুণ ভোটারদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে,
  • আর সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে গণতন্ত্রের নতুন প্ল্যাটফর্ম।

যদি এই জাগরণ জ্ঞানের আলোয় পরিণত হয়, তবে ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ। তবে এর জন্য দরকার দিকনির্দেশনা—কারণ রাগ ও আদর্শের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে চিন্তা ও শিক্ষার মাধ্যমে। জেন-জি প্রজন্ম আজ পৃথিবীর বিবেক। তারা একদিকে প্রযুক্তির সন্তান, অন্যদিকে মানবতার নতুন যোদ্ধা। এই প্রজন্ম হয়তো আগের সব প্রজন্মের মতোই ভুল করবে, কিন্তু তাদের প্রশ্ন, তাদের প্রতিবাদ, এবং তাদের স্বপ্ন—এই পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এক নতুন দিগন্তে।

লেখক: লিটন হোসাইন জিহাদ, কবি ও সাংবাদিক

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ