ঋতুচক্রের অবিরাম আবর্তনে জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে মহাকালের গভীরে বিলীন হতে চলেছে আরেকটি বাংলা বছর। দহনদগ্ধ চৈত্রের দুপুরে শুকনো পাতার মৃদু শব্দ যেন বাজিয়ে তোলে বিদায়ের বিষণ্ন সুর, আর সেই সুরেই লুকিয়ে থাকে নতুনের আগমনী বার্তা—নবজাগরণের নীরব প্রতিশ্রুতি।
আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল), বাংলা সনের অন্তিম দিন—৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; চৈত্র সংক্রান্তি। এটি কেবল একটি পঞ্জিকার সমাপ্তি নয়, বরং এক বছরের ক্লান্তি, গ্লানি ও ব্যর্থতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রতীকী মুহূর্ত। তাই এই দিন বিদায়ের হলেও, এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নতুন সূচনার অঙ্গীকার।
চৈত্র সংক্রান্তির আচার-অনুষ্ঠানে অঞ্চলভেদে বৈচিত্র্য থাকলেও এর মূল সুর এক—ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। একসময় এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে দিনটি পেয়েছে সর্বজনীনতা। পাহাড়ি অঞ্চলে তিনদিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু উদযাপিত হয়, যা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য প্রকাশ।
গ্রামবাংলায় এ দিনের আবহ আরও প্রাণবন্ত। পুরোনো হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন করে ‘হালখাতা’ খোলার মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের সূচনা করেন। খাদ্য সংস্কৃতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব—নিরামিষ আহার, ১৪ প্রকার শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ রান্না কিংবা ছাতু খাওয়ার প্রচলন প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দিনটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরও গুরুত্বপূর্ণ সময়। ব্রত, শিবপূজা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে তারা দিনটিকে অর্থবহ করে তোলেন। সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালানো যেন আগামী দিনের শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীকী প্রার্থনা।
সময়ের পরিবর্তনে শহুরে জীবনে চৈত্র সংক্রান্তির রূপ কিছুটা বদলালেও গ্রামীণ ঐতিহ্য এখনও অটুট। মেলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, যাত্রাপালা, লোকসংগীত—সব মিলিয়ে এ দিনটি হয়ে ওঠে বাঙালির শেকড়ের উৎসব। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও নানা আয়োজনে এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে।
এ বছরও দেশজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে লোকশিল্প প্রদর্শনী, ধামাইল নৃত্য, জারিগান, পটগান ও যাত্রাপালার মতো আয়োজন উৎসবকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
সব মিলিয়ে, চৈত্র সংক্রান্তি বাঙালির জীবনে এক অনন্য দিন—একদিকে বিদায়ের বেদনা, অন্যদিকে নতুনের স্বপ্ন। পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনকে বরণ করার এই চিরন্তন উৎসব প্রতি বছরই মনে করিয়ে দেয়—সময় বদলায়, কিন্তু ঐতিহ্য থাকে অমলিন।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।