মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হবে: বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করলেন তারেক রহমান
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় দিন আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিকভাবে গভীর সম্পর্ক ছিল এবং এই সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হলো—‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দলের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সঞ্চালনা করেন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।
ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপি বিশ্বাস করে—বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই। পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করবে।
দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান মেনে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না।
অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা ও আঞ্চলিক জোটগুলোর সঙ্গে নতুন বাজার সুবিধা ও প্রেফারেন্সিয়াল বাণিজ্য চুক্তি করা হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্পে মূল্য সংযোজন বাড়াতে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে শ্রম ও অভিবাসন কূটনীতি জোরদার করা হবে।
বাণিজ্য সুবিধা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক শক্তি ও প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করা হয়। রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা রক্ষায় কার্যকর কূটনীতি গ্রহণের কথাও বলা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানকে বিএনপির অগ্রাধিকার উল্লেখ করে ইশতেহারে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের পূর্ণ অধিকারসহ মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে এগোনোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি পদ্মা, তিস্তা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধ এবং চোরাচালান ও মাদক পাচার দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, এই সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করতে বিএনপি আন্তরিকভাবে কাজ করবে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলে উদ্বৃত্ত পুঁজিকে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সঙ্গে যুক্ত করে অর্থনৈতিক সংহতি অর্জনের লক্ষ্যও তুলে ধরা হয়।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন এবং সার্ককে কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, প্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির অঙ্গীকার করা হয়।
ইশতেহারে সফট পাওয়ার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে ‘পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট’ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
সবশেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও বিদেশে মিশন কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি প্রবাসীদের কল্যাণে দূতাবাসগুলোর তৎপরতা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
