সরাইলের ঐতিহাসিক হাতিরপুল: সাড়ে তিন শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ‎মুঘল আমলের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে বারিউড়ার প্রাচীন এই স্থাপনা ‎ ‎

সাড়ে তিন শতাব্দীর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ‎মুঘল আমলের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে বারিউড়ার প্রাচীন এই স্থাপনা
12487
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

‎ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বারিউড়া এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন হাতিরপুল। ইট ও চুন-সুরকিতে নির্মিত এই পুল শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়—এটি সরাইলের কয়েক শত বছরের ইতিহাস, যোগাযোগব্যবস্থা ও মুঘল আমলের স্থাপত্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

‎সরাইল উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বারিউড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ১০০ গজ পূর্বদিকে রাস্তার পাশে হাতিরপুলটির অবস্থান। পুলটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণাধীন প্রত্নসম্পদ।

‎নির্মাণের পেছনে যে ইতিহাস

‎স্থানীয় ইতিহাস ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সরাইলের দেওয়ান শাহবাজ আলী সরাইল থেকে শাহবাজপুরের দিকে যাতায়াতের জন্য একটি প্রাচীন সড়ক নির্মাণ করেছিলেন। এই সড়কটি আনুমানিক ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। স্থানীয়ভাবে পরিত্যক্ত প্রাচীন সড়কটির একটি অংশকে এখনো ‘জাঙ্গাল’ নামে ডাকা হয়।

‎এই জাঙ্গালের ওপরই নির্মিত হয়েছিল হাতিরপুল। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, সে সময় দেওয়ানরা হাতির পিঠে চলাচল করতেন। যাত্রাপথে হাতি নিয়ে পুলের কাছে বিশ্রাম নেওয়া হতো। সেই থেকেই পুলটির নাম হয় ‘হাতিরপুল’। সরকারি সরাইল উপজেলা পোর্টালেও এই জনশ্রুতির উল্লেখ রয়েছে।

‎হাতিরপুলের নিচ দিয়ে একসময় নৌযান চলাচল করত বলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ স্থাপনাটি শুধু সড়ক যোগাযোগের জন্য নয়, সে সময়কার জলপথ ও স্থলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

‎ইট ও চুন-সুরকির নির্মাণশৈলী এবং প্রাচীন যোগাযোগপথের সঙ্গে এর সম্পর্ক হাতিরপুলকে সরাইলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনায় পরিণত করেছে।

‎সরাইল উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে হাতিরপুলকে সরাইলের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলটিকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে।

‎সরাইল উপজেলার সরকারি পর্যটন তালিকাতেও হাতিরপুলকে পর্যটন স্পট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্বরোড হয়ে সিএনজি বা অন্যান্য যানবাহনে সেখানে যাওয়া যায় বলে সরকারি পর্যটন তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

‎হাতিরপুলের অবস্থান ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের একেবারে পাশে হওয়ায় এটি পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রতিদিন এই মহাসড়ক দিয়ে অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিচর্যা, তথ্যফলক, আলোকসজ্জা ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে হাতিরপুলকে ঘিরে স্থানীয় পর্যটন আরও বিকশিত হতে পারে।

‎বিকেলের সময় স্থানীয় মানুষ ও দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। সরকারি তথ্যেও পুলটির আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দর্শনার্থীদের আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

‎ঐতিহ্য রক্ষায় আরও উদ্যোগ প্রয়োজন

‎তবে কয়েক শত বছরের পুরোনো এই প্রত্নসম্পদ রক্ষায় শুধু সংস্কার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। স্থাপনাটির ঐতিহাসিক পরিচয়, নির্মাণকাল, প্রাচীন যোগাযোগপথ এবং স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে দর্শনার্থীদের জানাতে প্রয়োজন তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড ও পর্যাপ্ত প্রচারণা।

‎সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে হাতিরপুলের ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তিকরভাবে অন্য পরিচয়ে প্রচারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ফলে প্রত্নসম্পদটির প্রকৃত ইতিহাস ও সরকারি স্বীকৃতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

‎স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হাতিরপুলকে ঘিরে একটি পরিকল্পিত ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে পুলটির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, অবৈধ দখল ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করা এবং এর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‎হাতিরপুল তাই শুধু একটি পুরোনো পুল নয়; এটি সরাইলের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়। কয়েক শত বছর পেরিয়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি অঞ্চলের অতীতকে সংরক্ষণ করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার শিকড়কে তুলে দেওয়া।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PathikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PathikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ Pathik Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PathikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ