সুফি মাজার থেকে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ: ইতিহাসের বহু বাঁক পেরিয়ে আজকের বঙ্গভবন

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানি গভর্নর হাউজে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলাকালে ভারতীয় বিমানবাহিনী সেখানে হামলা চালায়। ফলে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তৎকালীন গভর্নর এ এম মালিক ও তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করেন।বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিপরিছদের বৈঠকে ভবনটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বঙ্গভবন’ এবং এটিকে রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র দিলকুশায় উঁচু প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত প্রাঙ্গণের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় ‘বঙ্গভবন’। বাহ্যিকভাবে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সর্বোচ্চ কেন্দ্র মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো এক দীর্ঘ ও চমকপ্রদ ইতিহাস।

 দক্ষিণ এশীয় কালচারাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া এই স্থানটি সুফি সাধকের মাজার থেকে শুরু করে নবাবদের বাগানবাড়ি, ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের গভর্নর হাউজ এবং সবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রতীক হয়ে উঠেছে।ইতিহাসবিদ ও বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গভবনের সূচনা খুঁজতে ফিরে যেতে হয় পঞ্চদশ শতকের সুলতানি আমলে। 

সুলতান ইউসুফ শাহের শাসনামলে সুফিসাধক শাহ জালাল দাখিনী গুজরাত থেকে পূর্ববঙ্গে এসে বর্তমান মতিঝিল এলাকায় একটি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৪৭৬ সালে তিনি নিহত হলে বঙ্গভবন চত্বরেই তাকে সমাহিত করা হয় এবং পাশেই কবর দেওয়া হয় তার অনুসারী শাহ কামালকে। 

ধীরে ধীরে এই সমাধিকে কেন্দ্র করেই এলাকাটি মাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেই গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধটি আজও বঙ্গভবন প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত রয়েছে।মুঘল আমলে এলাকাটি নতুন প্রশাসনিক পরিচিতি পায়। সুবাহদার মীর জুমলার আমলে নওয়ারা মহলের দায়িত্বে থাকা মির্জা মুকিমের বাসভবন ছিল এখানে, যা নদীপথ রক্ষা ও নৌবহর পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

প্রচলিত রয়েছে, মির্জা মুকিমের মেয়ের অলংকার ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান ‘মতিঝিল’ নামের উৎপত্তি হয়।ব্রিটিশ শাসনামলে জায়গাটির মালিকানা পরিবর্তিত হয়ে আর্মেনীয় জমিদার মানুকের হাতে যায় এবং এটি ‘মানুক হাউজ’ নামে পরিচিতি পায়। 

পরে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি স্থানটি কিনে লেক, ফোয়ারা, মাছের চৌবাচ্চা ও দেশি-বিদেশি গাছের সমন্বয়ে মনোরম ‘দিলকুশা বাগ’ গড়ে তোলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকাকে রাজধানী করা হলে প্রশাসনিক প্রয়োজনে দিলকুশা এলাকার দক্ষিণাংশে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য ‘গভর্নমেন্ট হাউজ’ তৈরি করা হয়। ১৯০৬ সালে উদ্বোধন ও ১৯১১ সালে নির্মাণ শেষ হওয়া এই ভবনটি ভাইসরয় ও গভর্নরদের ঢাকা সফরের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতো, যার মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক যাত্রা শুরু হয়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভবনটির নাম রাখা হয় ‘গভর্নর হাউজ’। ব্রিটিশ আমলের কাঠের তৈরি পুরোনো ভবনটি ১৯৬১ সালের এক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পরিত্যক্ত হয়। পরে তৎকালীন গভর্নর আজম খানের উদ্যোগে ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর আদলে নতুন ভবন তৈরি করা হয়, যার কাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালে এবং এটিই বর্তমান বঙ্গভবনের মূল স্থাপত্য। 

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানি গভর্নর হাউজে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক চলাকালে ভারতীয় বিমানবাহিনী সেখানে হামলা চালায়। ফলে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তৎকালীন গভর্নর এ এম মালিক ও তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিপরিছদের বৈঠকে ভবনটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বঙ্গভবন’ এবং এটিকে রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। 

১৯৭২ সালে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে এখানে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতির শপথ, সরকার গঠন, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ ও রাষ্ট্রপ্রধানদের অভ্যর্থনাসহ অজস্র ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে বঙ্গভবন। 

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রূপ বদলানো এই প্রাঙ্গণটি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ