বোনের শেষ কথা, মায়ের স্বপ্ন: প্রতিজ্ঞার পথে নির্জরের ভ্রমণ

মাকে নিয়ে মন্দিরে মন্দিরে ঘুরছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ নির্জর বোষনী বর্মণ। আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি জানছেন বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। তাঁর এই পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অকালে হারানো বোনের শেষ ইচ্ছা।
পথিকনিউজ
Share this storyWith image, headline and summary
Facebook WhatsApp X Telegram

“ভাই, তুই জীবনে অনেক বড় হবি, মাকে শ্রদ্ধাভরে যত্ন করে দেখবি আর মায়ের আদেশ পালন করবি।” নির্জর বোষনী বর্মণের স্মৃতিতে কথাগুলো আজও অমলিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে হাত ধরে এই কথাই বলেছিলেন একমাত্র বোন দীপ্তী বর্মণ। ২০২১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বোন চলে যান। থেকে যায় তাঁর শেষ কথাগুলো, যা নির্জরের কাছে এখন জীবন গড়ার এক প্রতিজ্ঞা।

সেই প্রতিজ্ঞা আর মায়ের স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুরছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার গোকর্ণঘাট গ্রামের এই তরুণ। কখনো মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মন্দিরে প্রার্থনা করছেন, কখনো দেখছেন প্রাচীন স্থাপত্য, জানছেন ভিন্ন দেশের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি। তাঁর ভ্রমণের সঙ্গে তাই জড়িয়ে আছে পারিবারিক ভালোবাসা, আধ্যাত্মিক অন্বেষণ এবং পৃথিবীকে জানার আকাঙ্ক্ষা।

নির্জরের মা দীপালী রাণী বর্মণ শ্রী স্বামীনারায়ণের ভক্ত। তাঁর ইচ্ছা, ছেলে দেশ-বিদেশের মন্দির পরিদর্শন করবেন, ধর্মীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে জানবেন। নিজেও ছেলের সঙ্গে বিভিন্ন মন্দিরে যেতে চান তিনি। মায়ের সেই ইচ্ছাকে নিজের পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে নিয়েছেন নির্জর। সুযোগ পেলেই মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর মাকে নিয়ে ভারত ভ্রমণ করেন তিনি। এ সময় তাঁরা দিল্লির স্বামীনারায়ণ অক্ষরধাম মন্দির, পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর এলাকার শ্রী স্বামীনারায়ণ মন্দির এবং শ্রী গণেশ ও বেঙ্কটেশ্বর মন্দির পরিদর্শন করেন। ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি দেখেন আগ্রার তাজমহল ও কলকাতার বিভিন্ন ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।

ছেলের সঙ্গে মন্দিরে মন্দিরে যেতে পেরে আনন্দিত দীপালী রাণী। আর নির্জরের কাছে মায়ের এই আনন্দই ভ্রমণের বড় প্রাপ্তি। যে ইচ্ছার কথা একসময় মায়ের মুখে শুনেছেন, তা একসঙ্গে পূরণ করতে পারার মধ্যে তিনি খুঁজে পান তৃপ্তি।

এর আগে ২০২৬ সালের ২১ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করেন নির্জর। ওই সফরে পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর এলাকার স্বামীনারায়ণ মন্দিরে পূজা-আরাধনায় অংশ নেন। তিনি জানান, সে সময় বিশেষভাবে মায়ের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করেছেন।

একই বছরের জানুয়ারিতে বৃন্দাবন, মথুরা, মায়াপুর ও নবদ্বীপসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান ঘুরেছেন তিনি। ২০২৫ সালে ভ্রমণ করেছেন মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। নেপালে পশুপতিনাথ মন্দিরও পরিদর্শন করেন।

নির্জর জানান, স্বামীনারায়ণের বিভিন্ন মন্দিরে নানা দেশ থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসেন। তাঁদের সঙ্গে পরিচয় এবং মন্দিরগুলোর পরিবেশ তাঁর ভ্রমণের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মন্দির ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ ভ্রমণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

২০০৩ সালের ১৫ আগস্ট গোকর্ণঘাট গ্রামে জন্ম নির্জরের। বাবা দিলীপ চন্দ্র বর্মণ ও মা দীপালী রাণী বর্মণের সন্তান তিনি। ভাই সৈকত বর্মণ এবং প্রয়াত বোন দীপ্তী বর্মণকে ঘিরে তাঁর বেড়ে ওঠার পারিবারিক স্মৃতি। পরিবারের দেওয়া পরিচয় অনুযায়ী, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণের উত্তরসূরি তিনি।

২০২৩ সালে এসএসসি ও ২০২৫ সালে এইচএসসি পাস করে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হয়েছেন নির্জর। পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে মেসার্স নির্জর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হিসেবে শুঁটকি এবং রড-সিমেন্টের ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

পড়াশোনা ও ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যেও সংগীত ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি টান রয়েছে তাঁর। আর ভ্রমণ তাঁকে দেয় নতুন কিছু শেখার সুযোগ। নির্জরের বিশ্বাস, অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজন নিজের অন্তর্জগৎকে সমৃদ্ধ করা, পৃথিবীকে দেখা এবং অন্যের ইতিহাস-সংস্কৃতিকে জানা। সেই ভাবনা থেকেই কাজের ফাঁকে ভ্রমণ ও আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সময় রাখেন তিনি।

তবে তাঁর জীবনের এই পথচলায় বোনকে হারানোর বেদনা গভীরভাবে মিশে আছে। নির্জর জানান, দীপ্তী ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রেরণা। অল্প বয়সে বোনের মৃত্যু পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা আজও অনুভব করেন তাঁরা। মায়ের যত্ন নেওয়ার প্রসঙ্গ এলেই তাঁর মনে পড়ে বোনের শেষ অনুরোধ।

নির্জরের কাছে মা তাঁর আশ্রয়, সাহস ও কাজের প্রেরণা। মায়ের স্বপ্ন পূরণকে তাই তিনি দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের আনন্দ হিসেবেও দেখেন। তাঁর বিশ্বাস, ভক্তি ও মায়ের আশীর্বাদ তাঁকে সৎভাবে চলার শক্তি জোগায়। নিজের এই পথচলার জন্য সবার আশীর্বাদ চেয়েছেন তিনি।

সামনে আরও দেশ, আরও মন্দির, আরও অচেনা সংস্কৃতি দেখার স্বপ্ন নির্জরের। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে আছেন তাঁর মা। আর স্মৃতিতে রয়ে গেছে বোনের হাত ধরে বলা কথাগুলো। মাকে নিয়ে প্রতিটি নতুন যাত্রায় সেই কথার মর্যাদা রাখার চেষ্টাই করে চলেছেন গোকর্ণঘাটের এই তরুণ।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ